আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অব্যাহতভাবে রাজধানী তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানের ড্রোন। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার কথা জানিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হারানোর পরও ইরানের এমন পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে দেশটি। একই সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে পেন্টাগন। এ যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারেড়এমনটি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানে হামলা চালানো ও তেহরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তারা ফ্লোরিডার টাম্পায় নিজেদের সদর দপ্তরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে অনুরোধ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করবেন ওই কর্মকর্তারা। যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা বলেছেন।
গতকাল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি বলেন, ইরান সংকট আগামী কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে এ সংকট কয়েক দিন নয়; বরং কয়েক সপ্তাহ এবং সম্ভবত কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। যুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কাতারভিত্তিক জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। সে কারণেই এমনটা হয়েছে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান বলেন, ‘আমার মনে হয়, করছিল যে এটি গতকাল আল-জাজিরাকে
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য: সম্ভবত গাদ্দাফির লিবিয়া বা সাদ্দামের ইরাকের মতো, যেখানে আপনি মূল নেতাকে সরিয়ে দেবেন এবং হঠাৎ পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে অথবা বিরোধীরা একজোট হয়ে মার্কিন বিমান হামলাকে সমর্থন জানাবে। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই ঘটেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অবিশ্বাস্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।’
পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত: গতকালও তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দিনভর তেহরানে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে। বেসামরিক স্থাপনায়ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮০ শিশু রয়েছে।
হামলায় তেহরানে বহু বহুতল ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এমন অনেকগুলো চিত্র গতকাল বিবিসি প্রকাশ করেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরানের অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় ৩ হাজার ৬৪৩টির বেশি বেসমারিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে। হামলার মুখে বাসিন্দাদের তেহরান ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা পাঁচ দিন পর গতকাল ঘর থেকে বের হয়ে তেহরানের গাছপালায় ঘেরা নাফথ স্ট্রিট দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘যানজটের কারণে যে পথটুকু পাড়ি দিতে সাধারণত দুই ঘণ্টা সময় লাগত, আজ তা অস্বাভাবিক দ্রুত পার হওয়া গেছে।’ ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বুধবার রাতে তিন দফায় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর গতকালও দেশটিতে হামলা চালিয়ে তেহরান।
ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১৯তম ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ইরাকের এরবিল ও কুয়েতের আরিফজানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, এর আগেই মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সেনাসদস্য ও ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে ১১ জন নিহত হয়েছেন। গতকালও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশ লক্ষ্য করে ইরান থেকে ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন ছোড়া হয়। এর মধ্যে ১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬টি ড্রোন দেশের ভেতরে আঘাত হেনেছে। দেশটিতে আকাশে ধ্বংস করা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন। কাতার ও বাহরাইনেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল ইরানের ছোড়া ১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। ইরাক উপকূলে বাহামার পতাকাবাহী একটি তেল ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরকভর্তি নৌযান দিয়ে ট্যাংকারে আঘাত হানা হয় বলে ইরাকের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে পারস্য উপসাগরের উত্তরে একটি মার্কিন তেল ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী।
এদিকে লেবাননে স্থল অভিযানের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ত্রিপোলি এলাকায় ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলের বিমান হামলায় হামাস নেতা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল আলী ও তাঁর স্ত্রী নিহত হয়েছেন। সোমবার থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ১০২ জন নিহত ও ৬৩৮ জন আহত।
Leave a Reply