তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান। গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে। ছিলেন সোয়ান ফুম কোম্পানীর সেলসম্যান। সাবেক মেয়র কামরানের আর্শিবাদে পেয়ে যান সিসিকের অফিস সহকারী কর্মকর্তা পদে চাকরি। হয়ে উঠেন সিসিকের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদের আস্থা ভাজন। তখন থেকে রং পাল্টাতে শুরু করেন তিনি। নির্বাচনে কামরান পরাজিত হলে ক্ষমতায় আসেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। পেয়ে যান একই উপজেলার বড় ভাইকে মেয়র হিসাবে। দুই ভাই মিলে সিসিকে গড়ে তুলে নিজেদের রাজত্য। পাল্টে যায় হানিফের রং-ধরণ, আচরণ। রাতা রাতি হয়ে ওঠেন আরিফুল হক চৌধুরীর আস্থাভাজন ব্যক্তি। দুজনের বাড়ি মৌলভীবাজারের একই উপজেলায় হওয়াতে বিশ্বস্থ হিসেবে হানিফকে কাছে টেনে নেন আরিফুল হক চৌধুরী।
আলাদিনের চেরাগ হাতে ধরিয়ে দেন হানিফুর রহমানের। ফলে অল্পদিনের মধ্যে নগর ভবনের মহারাজা হয়ে যান হানিফুর রহমান। সামনা-সামনি না বললেও নগর ভবনের ভেতরের সবাই হানিফুরকে মেয়রের খাসলোক তথা ‘বড় ছেলে’ হিসেবে চেনেন-জানেন। সেই সুযোগটা ভালো ভাবেই কাজে লাগিয়েছেন হানিফুর রহমান। ধরাকে সরাজ্ঞান করে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে দু’হাতে টাকা কামিয়ে যাচ্ছেন এখন পর্যন্ত। সিসিকের প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ ছাড়াও কনজারভেন্সী শাখার দায়িত্বে আছেন তিনি। একই ব্যক্তি বগলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। তার হাত দিয়েই হয় সিলেট নগর ভবনে নিয়োগ বাণিজ্য হয়ে থাকে। এ যাবত তার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অর্ধশতাধিক নিজ উপজেলা কমলগঞ্জের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালে আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রশাসনিক শাখার একক নিয়ন্ত্রন পুরোদন্তে নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হানিফের হাতে। এ দুই মেয়াদে হানিফের হাত ধরে অন্তত ৪০০ অধিক লোক নিয়োগ হয়েছে সিসিকে। দফতর বুঝে রয়েছে নিয়োগের নানা রকম বাণিজ্য।
সূত্রমতে, মাস্টাররোলে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪০০ অধিক লোকের কাছ থেকে জনপ্রতি অন্তত ৩/৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে প্রকৌশল শাখা, লাইসেন্স, স্বাস্থ্য শাখাসহ গুরুত্বপূর্ণ শাখায় চাকরিতে যোগদানকারীদের দিতে হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা করে। যদিও এ টাকার ভাগ তিনি একা হজম করেননি! জনশ্রুতি মতে মেয়রকে খুশি করেই হানিফুর রহমান এ নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। জনশ্রুতি মতে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজেটা হানিফের মাধ্যমে হাতিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করাশর্তে সিসিকের প্রকৌশল শাখার এক কর্মী জানান, এদফতরে নিয়োগ পেতে হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হয়। গত বছরেও সিলেটের একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির কয়েকজনকে পূর্ত শাখায় বড় অঙ্কের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আস্থাভাজনদের পদোন্নতিও দেওয়া হয় রাতারাতি। আর মাস্টাররোলে নিয়োগদের প্রতি মাসের বেতন থেকে অন্তত চার দিনের টাকা কেটে রাখা হয়। এ টাকারও কোনো হদিস থাকে না। এর বাইরেও রয়েছে অবৈধ আয়ের আরও অগণিত খাত। এসব খাত থেকে এক-দুই কোটি নয়, বর্তমান মেয়রের দুই মেয়াদে কী পরিমাণ টাকা পকেটস্থ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউই। তবে এ টাকার ভাগ কারা পান, তা কেবল হানিফ-ই জানেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে ওঠে আসে, সিসিকের কনজারভেন্সী শাখায় কাজ করেন এমন শ্রমিক আছেন ৪০০ জন। তাদের মধ্যে অফিসে নাইটগার্ড ও রিকশা নিয়ন্ত্রণে ১২০ জন, প্রতিটি ট্রাকে ৩/৪ জন করে ১৫০ জন, বিভিন্ন অফিস আদালতে ৩০/৪০ জন, ডাম্পিংয়ে কাজ করে আরও ১৫/২০ জন। আর ময়লার গাড়িতে কাজ করেন আরও ১৫০ জন। তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভাবে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা দিয়ে সিসিকে চাকরি নিয়েছেন। আর ময়লার গাড়ি ১০০টির মধ্যে প্রতিদিন অন্তত ৬০/৬৫টি গাড়ি চলে। এসব গাড়ি দিয়ে শহরের আবর্জনা পরিষ্কারের পাশাপাশি নগরীর আড়াই শতাধিক রেস্তোরা, শতাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য অপসারণ করতে নেওয়া হয় দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে। আর রেস্তোঁরার উচ্ছিষ্ট খাবার বিক্রি করা হয় বিভিন্ন মাছের খামারে। সেসব খামারিদের সঙ্গেও চুক্তিবদ্ধ হয়ে টাকা আদায় করেন হানিফের বিশ্বস্ত লোকজন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কনজারভেন্সী শাখাসহ বিভিন্ন শাখায় হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার দাগি অপরাধীদের চাকরি দিয়েছেন। এসব অপরাধীকে নিয়োগ দিয়ে দাপট খাটান তিনি। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় এমন ৫/৭ জনকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যারা তার কল্যাণে ছড়ি ঘুরান সিসিকে। এছাড়া দৈনিক মজুরি ভিত্তিকে কাজ করা লোকজনের কাছ থেকেও টাকা কেটে রাখা এবং বিভিন্ন হাসপাতাল ও মার্কেট, বিপনীবিতান থেকে ময়লা আবর্জনা অপসারণে কর্মীদের দিয়ে টাকা আদায় এবং ফুটপাতে বসা হকারদের কাছ থেকেও দৈনিক টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। করোনা কালীন সময়ে একটি বেসরকারী সিকিউরিটির কয়েকজন পাহাদারকে ছাঁটাই করেন হানিফুর রহমান, এরা দীর্ঘ দিন চাকরি করে সিটি কর্পোরেশনে। তাদের চাকরি স্থায়ী করণে হানিফুর রহমান প্রত্যেকের কাছে দেড় লক্ষ টাকা করে ঘুষ চান। চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারায় সে সব সিকিউরিটি গার্ডদের চাকরি আর স্থায়ীকরণ হয়নি।
অনুসন্ধানে ‘দুর্নীতির মহারাজা’ হানিফের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে মিলেছে পাহাড়সম সম্পদ। এছাড়া সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হানিফের নামে বে-নামে সম্পদ রয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চত করেন। হানিফুর রহমান ২০০১ সালের সিসিকে চাকরি নেওয়ার আগে সোয়ান ফোম কোম্পানির একজন সেলসম্যান ছিলেন। সেই হানিফ আজ বাড়ি-গাড়ি, জমিজমা, অট্টালিকার মালিক। তার কত টাকার সম্পদ রয়েছে নিজেও বলতে পারবেনা। সিলেট সিটি করপোরেশনের বরাদ্ধ করা প্লটও রয়েছে তার স্ত্রীর নামে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কমলগঞ্জের আর.এম ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলেছেন হানিফ। যে ফার্মে বিনিয়োগ করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। ফার্মে রয়েছে দেশি-বিদেশি দেড় শতাধিক গরু। রয়েছে মৎস্য খামারও। প্রায় সাড়ে ৩ একর জায়গা জুড়ে গরুর জন্য উন্নত জাতের ঘাষেরও চাষ করেন তিনি। ২০১৪ সালে শুরু করা খামারের মালিক তার স্ত্রীর বলে দাবি করেছেন হানিফুর রহমান নিজেই। তবে খামারটি দেখাশোনা করতে দেখা গেছে তার ভাতিজা হাবিবুর রহমান জাবুলকে। হাবিবুর রহমান জাবুল বলেন, ফার্মে তার বাবা আলতাফুর রহমান, চাচা হানিফুর রহমান ও চাচী (হানিফুর রহমানের স্ত্রী) মেহেরুন নেছার অংশ রয়েছে। ফার্মটি করা হয়েছে তার দাদির নামে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা বলেন, একদশক আগে হানিফের তেমন কিছু ছিলনা। কেবল সিলেট সিটি করপোরেশনে চাকরির সুবাদে তিনি অঢেল সম্পদের বনে গেছেন। নামে-বেনামে আরও অসংখ্য জমিজমা রয়েছে তার। আর খামারে সিলেট সিটি করপোরেশন বিলবোর্ডের লোহার পিলার লাগানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিসিকের বিলবোর্ডের খুঁটিগুলো নগরীর দক্ষিণ সুরমার মেনিখলায় হানিফের বন্ধু সেলিমের মাধ্যমে আদমপুর পাচার করা হয়েছে। যদিও হানিফুর রহমান বলেছেন, এসব পিলার তিনি চট্টগ্রাম থেকে কিনে এনেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, লোক নিয়োগ, দৈনিক মজুরিতে কাজ করা কনজারভেন্সী শাখার কর্মীদের বেতন কর্তন করে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হানিফ। সিসিকের ২৮ লাখ টাকা মূল্যের ৫৩৫টি পানির মিটার গায়েবের ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটিতেও ছিলেন হানিফ। এ ঘটনায় ৮ জনকে বরখাস্ত করা হলেও তদন্তে চারজনকে অভিযুক্তরা করলেও শাস্তির বিষয়টি অজ্ঞাত থেকে যায়। নগরের বাগবাড়িতে তার স্ত্রীর নামে নেওয়া প্লট উল্টে কসাই খানার জন্য সিসিককে ভাড়া দিয়েছেন। তার স্ত্রী মেহেরুননেছা ওই প্লটের ভাড়া ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা বৃদ্ধির জন্য সিসিক কর্তৃপক্ষ বরাবরে আবেদনও করেন। ওই আবেদনে মেহেরুন নেছা তার স্বামীর পরিচয় গোপন রেখে বাবার নাম মো. খতিব মিয়া লিখেন। এছাড়া নগরীতে নামে বেনামে সম্পদ গড়ে তুললেও চৌহাট্টা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন হানিফুর রহমান। নগর ভবনে সতীর্থরা ইতোমধ্যে তাকে দুর্নীতির মহারাজা নাম দিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে হানিফুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, আমি ২০০১ সালে সিটি করপোরেশনে চাকরি নিয়েছি। লোক নিয়োগ হয় আমার মাধ্যমেই। তবে তার নিজের স্বজনদের নিয়োগ ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। আর গ্রামে ডেইরি ফার্মটি উদ্যোক্তা তার স্ত্রী বলে দাবি করে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী সিলেট থেকে ও মাঝেমধ্যে সেখানে গিয়ে ফার্মটি দেখাশোনা করেন। অথচ ডেইরি ফার্ম নিয়ে তৈরি একটি ডকুমেন্টারিতে বলা হয়, তার স্ত্রী মেহেরুন্নেছা গ্রামে থেকেই এসব দেখাশোনা করেন। প্রায় দেড় একর জায়গা জুড়ে ফার্ম ও ১২ কেদার জায়গাতে গরুর ঘাস চাষের কথা স্বীকার করেন তিনি।
স্ত্রীর নামে প্লট বরাদ্দের বিষয়ে হানিফুর রহমান গণমাধ্যমেকে বলেন, চাকরিতে যোগদানের আগে তার মামা প্লটটি তার স্ত্রীকে দান করেছেন। একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
Leave a Reply