নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) মোঃ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে কোটি টাকার ঘুষ, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য এবং নারী শিক্ষকদের যৌন হয়রানির পাহাড়সমান অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এক ‘দুর্নীতির সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তদন্ত শুরু করেছে।
সূত্রমতে, বিগত ২০১৮ সাল থেকে টানা ৭ বছর গোয়াইনঘাটে কর্মরত ছিলেন আশরাফুল আলম। সরকারি বিধি অনুযায়ী তিন বছরের বেশি একই স্টেশনে থাকার বিধান না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান করেন। গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ২৫টি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। অভিযোগের তদন্তে গত ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে গোয়াইনঘাট উপজেলা শিক্ষা অফিসে আসেন অধিদপ্তরের শিক্ষা অফিসার (সাধারণ প্রশাসন) জিয়া উদ্দিন আহম্মদ।
টাকার বিনিময়ে বদলি বাণিজ্য:
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আন্তঃউপজেলা বদলিতে নীতিমালা লঙ্ঘন করে কুলুমছড়ারপার সপ্রাবি’র শিক্ষক জুবেদা বেগমকে এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দক্ষিণ সুরমায় বদলির সুযোগ করে দেন তিনি। এছাড়া নজরুল ইসলাম, সাবিহা বেগম, শাহানারা বেগমসহ একাধিক শিক্ষকের কাছ থেকে বদলি বাবদ ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক শিক্ষিকার বদলি না হওয়ায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তার কাছে অনিয়ম হচ্ছে নিয়ম:
আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান (চতুর্থবারের মতো), টাকার বিনিময়ে অবৈধ সংযুক্তি (ডেপুটেশন) এবং প্রবাসে থাকা শিক্ষকদের বেতন সচল রাখার বিনিময়ে মাসিক ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বিদ্যালয়ের গাছ বিক্রির কমিশন না পেয়ে প্রধান শিক্ষককে হয়রানি করে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। পরিদর্শন শেষে মোটরসাইকেলের তেল খরচের নামে ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়া ছিল তার নিয়মিত কালেকশন।
যৌন হয়রানি,‘গরু’ ও ‘মালয়েশিয়ার টিকিট’ কান্ড:
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি হলো নারী শিক্ষকদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন। প্রশিক্ষণের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া এবং তাতে রাজি না হওয়ায় মহিষখেড় সপ্রাবি’র সহকারী শিক্ষক তাপসী রাণী দেব চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আদর্শ সপ্রাবি’র এক শিক্ষকের কাছে বদলির বিনিময়ে ‘গরু’ এবং ‘মালয়েশিয়ার রিটার্ন টিকিট’ দাবি করার মতো বিচিত্র দুর্নীতির তথ্যও উঠে এসেছে।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত এটিইও আশরাফুল আলম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে গোয়াইনঘাটের বর্তমান শিক্ষা অফিসার ইফতেখার আহমদ গণমাধ্যমে জানান, ২৫টি লিখিত অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
প্রাথমিক শিক্ষার বিভাগীয় উপ-পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার গণমাধ্যমে জানান, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত চলছে। অন্যদিকে, তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিন আহম্মদ গণমাধ্যমে বলেন, “অভিযোগের প্রেক্ষিতে সঠিক তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চাকরিবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
গোয়াইনঘাটের সাধারণ শিক্ষকদের দাবি, এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে
Leave a Reply