নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন যাবৎ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম, দরপত্র বাণিজ্য এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূত হস্তক্ষেপের অভিযোগ এক চরম রূপ পরিগ্রহ করেছে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) আশরাফুল হক এবং প্রভাবশালী ঠিকাদার মো. সাইদুল ইসলাম সোরাবের সমন্বয়ে গঠিত এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট বর্তমানে সমস্ত প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
গত ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরেও এই অশুভ চক্রটি পূর্বের ন্যায় আধিপত্য বজায় রেখেছে। সাবেক গণপূর্তমন্ত্রীর কথিত অর্থ সংগ্রাহক এবং জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় হিসেবে পরিচিত সাইদুল ইসলাম সোরাব বর্তমানে অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ইএম) বিভাগগুলোতে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বিস্তার করছেন। সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে এবং ‘প্রফেসর মনির’ নামক এক ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়ে তিনি একের পর এক বৃহৎ প্রকল্প হাতিয়ে নিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে যে, আল মদিনা ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী সাইদুল ইসলাম বিগত কয়েক বছরে প্রশাসনিক আনুকূল্যে বিপুল সংখ্যক কাজ বাগিয়ে নিয়ে কৃত্রিম অভিজ্ঞতার সনদ তৈরি করেছেন। সম্প্রতি কুমিল্লায় ভুয়া অভিজ্ঞতাপত্র দাখিল করে কাজ পাওয়ার চেষ্টার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। সংসদ ভবন, সচিবালয় ও মন্ত্রিপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহ এই সিন্ডিকেটের কবজায় থাকায় সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজমান। দরপত্রের কারিগরি শর্তাবলীতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট এই প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদান করা এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি করার মতো অভিযোগগুলো এখন লোকমুখে প্রচলিত।
তদন্তে জানা গেছে, সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতির তালিকায় এমন অনেক প্রকৌশলীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা বাধ্যতামূলক সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। এই বিধি বহির্ভূত পদোন্নতি নিশ্চিত করতে বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যোগ্যতাকে পাশ কাটিয়ে আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে একটি অভ্যন্তরীণ সমর্থন কাঠামো তৈরির মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে পদদলিত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি, এই দুর্নীতির লব্ধ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটের শক্তিশালী প্রভাবের কারণে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনেকেই শঙ্কিত। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পদোন্নতি ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় এই হস্তক্ষেপ সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি এবং দুর্নীতি দমন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পরিশেষে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রশাসনিক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply