মোঃ রায়হান হোসেন: গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরার অপচেষ্টা ও নাটকীয় পিছুটানে ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পদের নৈতিকতা ও আইনি এখতিয়ার নিয়ে নজিরবিহীন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, গগনচুম্বী দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরপরই তাঁর স্বাক্ষরিত একটি ‘গণমাধ্যম নির্দেশনামূলক’ বিতর্কিত গণবিজ্ঞপ্তি জনমনে চরম ক্ষোভের উদ্রেক করেছে। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে জারির মাত্র ১২ ঘণ্টার মাথায় সেই ‘তুঘলকি’ ফরমান প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
ঘটনার নেপথ্য: দুর্নীতির সংবাদ বনাম আইনি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ: গত ২৯ এপ্রিল ‘সিলেটপ্রেসবিডি’ নামক একটি অনলাইন পোর্টালে কমিশনারের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসএমপির ভেরিফায়েড পেজে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সেখানে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধনহীন অনলাইন পোর্টাল বন্ধের নির্দেশ এবং পাঠকদের লাইক-শেয়ার থেকে বিরত থাকার ‘হুকুম’ দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সংবাদ প্রবাহে দিকনির্দেশনা দেওয়ার আইনি এখতিয়ার কেবল তথ্য মন্ত্রণালয় বা আদালতের। পুলিশের এই ‘অতি-উৎসাহী’ পদক্ষেপকে স্বাধীন সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। রহস্যজনকভাবে, বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের কিছুক্ষণ পরেই সংশ্লিষ্ট পোর্টাল থেকে সংবাদটি উধাও হয়ে যায়, যা কোনো বিশেষ ‘সমঝোতা’ বা ‘চাপের’ ইঙ্গিত দেয়।
‘৭১’ সংকেত ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের রহস্য:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কমিশনার কুদ্দুছ চৌধুরী সিলেটে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত অঞ্চল থেকে রাতের আঁধারে চোরাচালান নির্বিঘ্ন করতে তিনি ‘৭১’ নামক একটি বিশেষ সাংকেতিক সংখ্যা প্রবর্তন করেছেন। এই সিন্ডিকেটটি কথিত সাংবাদিক ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি মুহিতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, এই চোরাচালানের লভ্যাংশ থেকে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অঙ্কের অর্থ সরাসরি কমিশনারের দপ্তরে পৌঁছায়।
পারিবারিক স্বজনপ্রীতি ও ‘মামলা বাণিজ্য’:
দুর্নীতির এই জাল কমিশনারের অন্দরমহল পর্যন্ত বিস্তৃত। পুলিশ লাইন্সের মেসগুলোতে খাদ্য সরবরাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে তাঁর সহধর্মিণী সিদরাতুল মুনতাহার হাতে। এছাড়া ‘জিনিয়া’ নামক একটি অকার্যকর অ্যাপ প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার না করার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুঙ্গে। বিশেষ করে, নজরুল ইসলাম বাবুল নামক এক আসামির সাথে দুই কোটি টাকার বিনিময়ে আপোসের বিষয়টি জনমনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
নৈতিক স্খলন ও পৈতৃক সম্পত্তির বিরোধ:
কেবল প্রশাসনিক নয়, কমিশনারের ব্যক্তিগত জীবনও বিতর্কমুক্ত নয়। তাঁর আপন ভ্রাতা আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী খোদ ফেসবুক লাইভে এসে ভাইয়ের নৈতিক স্খলন ও পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন। এছাড়া ২০০৩ সালে জনৈক সংখ্যালঘু তরুণীকে বলপূর্বক বিবাহের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও এখন সামনে এসেছে, যা তাঁর পেশাগত ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রশাসনের অবস্থান ও তদন্তের দাবি:
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসএমপির অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র বিভাজন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে এসব অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। যদিও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম এবং স্বয়ং কমিশনার আইনি দোহাই দিয়ে বিজ্ঞপ্তিটিকে বৈধ দাবি করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার সকালে নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূর্বের আদেশটি বাতিল করা হয়।
জনদাবি:
সিলেটের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ এই দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কবল থেকে পুলিশ প্রশাসনকে মুক্ত করতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সাংবাদিক মহলের মতে, পুলিশের কাজ অপরাধ দমন করা, সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারণ বা সেন্সরশিপ আরোপ করা নয়।
Leave a Reply