ফারুকের অঢেল সম্পদ – তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

ফারুকের অঢেল সম্পদ

বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন দুর্নীতির শেকড় গেঁথে আছে। এখানে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। বিগত সময়ে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব ও ছত্রছায়াকে পুঁজি করে এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়ে উঠেছিলেন চরম বেপরোয়া। জবাবদিহিহীন সেই কাঠামোতে অনেকেই হাতে পেয়েছিলেন ‘আলাদিনের চেরাগ’, যার ছোঁয়ায় পরিচ্ছন্নকর্মী থেকে শুরু করে গাড়ি চালকরা পর্যন্ত রাতারাতি বনে গেছেন অঢেল সম্পদ ও বাড়ি-গাড়ির মালিক। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার এবং দুর্নীতির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করলেও সিসিকের চিত্র যেন এখনো বদলায়নি। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো তাদের পুরনো সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন। এমন দুর্নীতিবাজদেরই একজন হলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন শাখার কর্মচারী ফারুক আহমদ।

গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের রাউতগ্রামের শফিকুর রহমানের পুত্র ফারুক আহমদ। সিসিকের নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ২০০৬ সালে তিনি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশনে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আদালতের একটি রায়ের মাধ্যমে তিনি পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক (সুপারভাইজার) পদে স্থায়ী নিয়োগ পান। চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর থেকেই মূলত তার দুর্নীতির ডালপালা মেলতে শুরু করে। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একজন সাধারণ পরিদর্শকের বেতনকাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে তিনি অল্পদিনেই গড়ে তুলেছেন বিপুল বিত্তবৈভব, যা হার মানায় রূপকথার গল্পকেও। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ফারুক আহমদ সিসিকের অভ্যন্তরে নিজের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি নিজের ভাই, ভাগ্না, শ্যালক এবং নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে অন্তত দেড়শতাধিক ব্যক্তিকে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগের বিপরীতে তিনি চালিয়েছেন কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য। সরকারি একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে তিনি রীতিমতো নিজের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা দিয়ে ফারুক আহমদ নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। সিসিকের এই কর্মচারীর দৃশ্যমান যে সম্পদের খোঁজ মিলেছে, তা দেখে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদেরও চোখ কপালে ওঠার কথা। ১। শহরতলীর বটেশ্বর চুয়াবহর এলাকায় তার একটি ৫ তলা বিলাসবহুল বাড়ির নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ২। নগরীর আলমপুর আবাসিক এলাকায় হাফিজি মাদ্রাসার ঠিক পাশেই (পিচ্চি বাবুলের বাসার সংলগ্ন) তার ১২ ডেসিমেলের একটি মূল্যবান প্লট রয়েছে। ৩। সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের ঠিক বিপরীত পাশে বাণিজ্যিক এলাকায় তার আরও ৮ ডেসিমেলের একটি খালি প্লট রয়েছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। ৪। গোয়াইনঘাট উপজেলার ইউনিয়ন অফিসের সাথে বাইপাস এলাকায় ফারুকের নামে রয়েছে প্রায় ৮ বিঘা জমি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি।

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও ফারুক আহমদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রকাশ্যে আসার ভয়ে এবং ট্যাক্স রিটার্নে আয়ের সাথে অর্জিত সম্পদের অসামঞ্জস্যতা ঢাকতে গত বছর পর্যন্ত তিনি টিআইএন (TIN) বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের অন্তর্ভুক্ত হননি। নিজেকে নিরাপদ রাখতে তার অবৈধ সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের একটি বড় অংশই তিনি শশুরবাড়ির লোকজনের নামে (বেনামে) করে রেখেছেন। তার বিলাসী জীবনের ছাপ পড়েছে আত্মীয়-স্বজনের জীবনযাত্রাতেও। ফারুকের দুর্নীতির বড় সুবিধাভোগী তার শশুরবাড়ির লোকজন। তার এক শ্যালক সাদিক, যাকে তিনি সিসিকের ড্রাইভার পদে চাকরি দিয়েছেন, তাকে তিনি উপহার দিয়েছেন একটি দামি ‘ইয়ামাহা আর-১৫’ (R15) মোটরসাইকেল। সাদিক বর্তমানে মেজরটিলা সৈয়দপুর এলাকায় ফারুকের একটি বাসাতেই বসবাস করেন। তার অপর এক শ্যালককে কিনে দিয়েছেন একটি ‘টয়োটা নোহা’ (Noah) মাইক্রোবাস। এখানেই শেষ নয়, মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে আরেক শ্যালককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। একজন সাধারণ পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক হয়ে আত্মীয়দের পেছনে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় পুরো নগর ভবনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এসব সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ফারুক আহমদের সাথে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বভাবতই সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, “জ্ঞাত আয় বহির্ভূত আমার কোনো সম্পদ নেই। যে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, তা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া।” নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে তিনি ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন। তবে ফারুকের এই দাবির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। নগর ভবন ও তার নিজ এলাকার একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে তার এই অঢেল সম্পদের বিষয়টি। সচেতন নাগরিক সমাজের প্রশ্ন— একজন সামান্য পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক হয়ে তিনি কীভাবে শহরে একাধিক প্লট, বহুতল ভবন এবং কোটি কোটি টাকার জমির মালিক হলেন?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন রাষ্ট্রের সব স্তরে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম করছে, তখন সিসিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ফারুক আহমদের মতো কর্মচারীদের এমন আস্ফালন ও দুর্নীতির পাহাড় গোটা সিস্টেমের জন্যই এক বড় অশনিসংকেত। ফারুকের এই অবৈধ সম্পদের উৎস, নিয়োগ বাণিজ্য এবং কর ফাঁকির বিষয়টি দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo