বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) যেন এখন নাগরিক সেবার কেন্দ্র নয়, বরং কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অবাধ লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। একদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী আকবরের স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য, অন্যদিকে প্রশাসকের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (সিএ) ফয়জুর রহমানের লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্য এই দুই অশুভ চক্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সিসিকের উন্নয়ন ও সুনাম।
সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী আকবর মুখে সিলেটের মানুষের প্রতি চরম বিদ্বেষ দেখালেও, এই পুণ্যভূমিতে বসেই গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের এক বিশাল সাম্রাজ্য। সিসিকের দাপ্তরিক কার্যক্রম নিজের পকেটে পুরতে তিনি উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহ আলম, মামুন এবং রাজিব গংদের নিয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
তার দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ও নগ্ন দৃষ্টান্ত হলো সিলেটের বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে এই বিশাল অংকের টেন্ডার সুকৌশলে তিনি তুলে দিয়েছেন নিজের আপন ভাই হেলালের প্রতিষ্ঠান ডালি কনস্ট্রাকশন-এর হাতে। এখানেই শেষ নয়, এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের সুবাদেই সিসিকে অত্যন্ত রহস্যজনক ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয় তার নিজস্ব বলয়ের সদস্য শাহ আলম, মামুন ও রাজিবকে।
আলী আকবরের আঞ্চলিক বিদ্বেষ এখন ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমেদ তানভিরের স্ত্রী প্রকৌশলী তান্নীর ফাঁস করা তথ্যে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সত্য। আলী আকবর সিলেটিদের তখনই ‘ভালোবাসেন’, যখন তারা তার সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত করে এবং তার সমস্ত অন্যায় আবদার মুখ বুজে মেনে নেয়। অন্যথায় সিলেটের মানুষদের তিনি দু’চোখে দেখতে পারেন না।
অন্যদিকে, নগর ভবনের বর্তমান প্রশাসকের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি থাকলেও, খোদ তার নাকের ডগায় বসে দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য জাল বিছিয়েছেন তারই প্রধান সহকারী (সিএ) ফয়জুর রহমান। প্রশাসকের দপ্তরে এখন অলিখিত নিয়ম টাকা ছাড়া নড়ে না ফাইল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফয়জুর রহমানের এই লুটপাটের প্রধান দোসর সিসিকের আরেক বিতর্কিত প্রকৌশলী রাজিউদ্দিন। রাজিউদ্দিনের সমস্ত অনিয়ম ও ঠিকাদারি নথিপত্র প্রশাসকের দপ্তর থেকে চোখ রাঙিয়ে বা সুকৌশলে অনুমোদন করিয়ে দেন ফয়জুর। বিনিময়ে হাতিয়ে নেন পাহাড়সম কমিশন।
সিসিকের একজন অতি সাধারণ কর্মচারী হয়েও ফয়জুর রহমান এখন আলাদিনের চেরাগের মালিক। অবৈধ আয়ের টাকায় জালালাবাদ আবাসিক এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন এক সুরম্য ও বিলাসবহুল বহুতল অট্টালিকা। পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও রয়েছে তার বিপুল পরিমাণ বেনামি বিনিয়োগ। সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীরা জরুরি কাজে তার দপ্তরে গেলে আইনি মারপ্যাঁচে তাদের নাজেহাল করা হয়। পরবর্তীতে দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিলেই জাদুর মতো সচল হয় আটকে থাকা ফাইল। তার এই বেপরোয়া চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না খোদ সিসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। বদলি বা পদোন্নতির জন্যও তাকে দিতে হয় ঘুষের ভাগ।
সিসিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন লাগামহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিক বিদ্বেষ জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সুশীল সমাজ ও সচেতন নগরবাসীর দাবি, বর্তমান প্রশাসকের উচিত অবিলম্বে ঘুম থেকে জেগে ওঠা। তার সততাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ফয়জুর-রাজিউদ্দিন ও আলী আকবর সিন্ডিকেট যে দুর্নীতির সাম্রাজ্য কায়েম করেছে, তা সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী নগরবাসী। অন্যথায় সিসিকের সমস্ত উন্নয়ন এই লুটেরা সিন্ডিকেটের পেটে চলে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
Leave a Reply