শাহপরানের পর মোগলাবাজারেও ওসি মনিরের ত্রাসের রাজত্ব, মুখ খুললেন সাবেক বডিগার্ড! | তদন্ত রিপোর্ট

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

শাহপরানের পর মোগলাবাজারেও ওসি মনিরের ত্রাসের রাজত্ব, মুখ খুললেন সাবেক বডিগার্ড!

শাহপরানের পর মোগলাবাজারেও ওসি মনিরের ত্রাসের রাজত্ব, মুখ খুললেন সাবেক বডিগার্ড!

Manual2 Ad Code

মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেটের শাহপরান (রহ.) থানায় কর্মরতকালীন ওসি মনিরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ সব অভিযোগ সামনে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওসি মনিরের সাবেক বডিগার্ডের বিস্ফোরক কিছু তথ্য প্রতিবেদককের হাতে আসার পর তার ‘মাফিয়া স্টাইলে’ থানা চালানোর চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্বরত মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ পুরো প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওসি মনির যেখানেই যান, সেখানেই গড়ে তোলেন অপরাধের এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। তার আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অবৈধ ঘুষ বাণিজ্যের টাকা।

Manual6 Ad Code

নাম না প্রকাশের শর্তে ওসির সাবেক এই বডিগার্ড জানান- শাহপরান থানায় থাকাকালীন ওসি মনির ‘নিজে লক্ষ লক্ষ টাকা নিতেন’ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। শুধু তাই নয়, নিজের অপকর্ম আড়াল করতে ‘পরে ধরা খাইলে অন্যদের ফাঁসিয়ে দিতেন’ বলে তার সাবেক এ বডিগার্ড উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, অপরাধ তিনি নিজে করলেও দোষ চাপাতেন অধীনস্থ বা নিরীহ পুলিশ সদস্যেদের ওপর। অবৈধ উপায়ে উপার্জিত এই ‘কালো টাকা’ পাচারের ব্যবস্থাও ছিল সুপরিকল্পিত।

Manual1 Ad Code

বডিগার্ডের দেওয়া তথ্যমতে, অবৈধ উপায়ে উপার্জিত লাখ লাখ টাকা কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হতো ওসির নিজ এলাকা ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহের কাশর এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে একটি তিনতলা বিলাসবহুল ভবন, যার নির্মাণকাজ এখন শেষ পর্যায়ে। ওসি মনিরের মেজ ছেলে আকিব এবং ময়মনসিংহ কাশর এলাকার বাসার কেয়ারটেকার মোস্তফার নম্বরে বিভিন্ন দোকান থেকে লক্ষ লক্ষ অবৈধ টাকা পাঠানো হতো। টাকার প্রতি ওসি মনিরের আকাঙ্ক্ষাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তার সাবেক এই সহযোগী। এমনকি তার সরকারি বেতনের ৭০ শতাংশ টাকা ব্যাংকের লোনের কিস্তি পরিশোধে চলে যেত বলে জানা গেছে, অথচ তার বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ছিল আকাশচুম্বী। ওসির বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে গুরুতর এবং লজ্জাজনক অভিযোগটি হলো নারী পুলিশ সদস্যদের সাথে তার অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন।

তার সাবেক এই বডিগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এই বয়সে তার লুইচ্ছামির শেষ নেই’। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কোনো নারী পুলিশ সদস্য যদি তার এই ‘অনলাইনে’ (অর্থাৎ তার অনৈতিক প্রস্তাব মেনে নিয়ে) চলতেন, তাহলে ‘তাকে ডিউটি করা লাগত না’। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন আচরণ বাহিনীটির জন্য চরম অবমাননাকর এবং পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। শাহপরান থানা এলাকায় ৫-৬ টি ‘মাটি কাটার বেকু’ (এস্কাভেটর) থেকে সাপ্তাহিক ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হতো। থানার সামনে ‘মৌলা’ নামক জনৈক ব্যক্তির মাটি কাটার স্থান থেকেও সাপ্তাহিক ১০ হাজার টাকা চাদা তুলতেন ড্রাইভার, তখন ওসি গাড়িতেই বসা থাকতেন। এছাড়া ভারতীয় কমলা চোরাচালানের গাড়ি থেকেও নিয়মিত মাসোহারা তোলা হতো। এই ঘুষের টাকা তোলার দায়িত্ব ছিল ড্রাইভারের ওপর। পরবর্তীতে বডিগার্ডদের মাধ্যমে এই টাকা নেওয়া হতো। ঘুষ নেওয়ার এই সিন্ডিকেটের কথাও সাবেক এ বডিগার্ড প্রকাশ করেছেন। পরে এসব বিষয় নিয়ে ঝামেলা তৈরি হলে বা তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে তিনি এই বডিগার্ডদের পোস্টিং করিয়ে দেন। বর্তমানে ওই বডিগার্ড চট্টগ্রাম রেঞ্জে বদলি হয়ে গেছেন বলে জানান তিনি।

Manual5 Ad Code

ওই বডিগার্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী আরও ভয়াবহ একটি তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। ওসি মনির তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তোয়াক্কা করেন না এবং তাদের সামনে মিথ্যাচার করেন বলে অভিযোগ। বডিগার্ড বলেন, ‘ও নাকি বলছে কমিশনার স্যারকে আমি টাকা তুলিনি, টাকা তুলছে ড্রাইভার বডিগার্ড’। অর্থাৎ, নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য তিনি অধীনস্থদের ওপর দায় চাপিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করছেন।।

Manual7 Ad Code

ওই বডিগার্ড আরও অভিযোগ করন, ‘ইন্ডিয়ান অনেক গাড়ি’ (সম্ভবত অবৈধভাবে আসা পণ্য বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা) থেকে টাকা নিতেন তিনি। সাবেক বডিগার্ডের দেওয়া এসব তথ্য ওসি মনিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণে শক্ত ভিত্তি প্রদান করে। তবে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। প্রশাসনের ভেতর থেকেই এমন ‘মাফিয়া স্টাইলে রাজত্ব’ চালানো সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া বিস্ময়কর। মোগলাবাজার থানার ওসির দায়িত্বে থেকে তিনি নতুন করে এমন কোনো অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন কিনা, তা নিয়েও জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একশ্রেণির সংবাদকর্মীর ভূমিকা। অভিযোগ উঠেছে, একটি অংশ এই সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ‘দালালিতে’ লিপ্ত রয়েছে। যেখানে সত্য প্রকাশ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলা সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব, সেখানে ক্ষমতার আড়ালে থাকা অপরাধীকে রক্ষা করার এই প্রচেষ্টা দেশের সাংবাদিকতার আদর্শকে চরমভাবে কলঙ্কিত করছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন এই সাংবাদিকরা কি আসলে অপরাধের সহযোগী, নাকি নীরব সুবিধাভোগী?

ওসি মনিরের মতো কর্মকর্তারা পুলিশের সুনাম এবং জনমনে বাহিনীর আস্থার জায়গাটিকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিচ্ছেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, অধীনস্থদের ফাঁসিয়ে এবং অনৈতিক উপায়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে তারা সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। শাহপরান ও মোগলাবাজার থানায় ওসি মনিরের প্রতিটি অপকর্মের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান, জনস্বার্থে এবং পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় ওসি মনিরের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code