মোঃ রায়হান হোসেন:
আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের রক্ষায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) দীর্ঘদিনের টালবাহানার অবসান ঘটলো। গত সোমবার (৩১ আগস্ট) জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকায় “আদালতের নির্দেশ অমান্য: সিলেটে ৩ পুলিশকে রক্ষায় এসএমপির অনীহা!” শীর্ষক অনুসন্ধানী খবর প্রকাশের পরই টনক নড়েছে পুলিশ প্রশাসনের। প্রকাশিত খবরের জেরে তুমুল সমালোচনার মুখে অবশেষে মোগলাবাজার থানার বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে এসএমপি সদর দপ্তর।
প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম, বিপিএম স্বাক্ষরিত এক দপ্তর আদেশের (স্মারক নং- ৪৮-২০২৬/গোপ/১০০/২০২৬) মাধ্যমে ওসি মনির হোসেনকে মোগলাবাজার থানা থেকে প্রত্যাহার করে এসএমপি’র পুলিশ লাইন্সে (সদর ও প্রশাসন বিভাগ) সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশে জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মোগলাবাজার থানায় স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে দায়েরকৃত জিআর ০৫/২৬ নং মামলার মাধ্যমে এই নজিরবিহীন দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। একটি কাভার্ডভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হলেও মামলার এজাহারকারী কর্মকর্তা জিতেন চন্দ্র দাশ কোনো প্রকার গণনা ছাড়াই মনগড়াভাবে ৪৩০ পিস কম্বল জব্দ দেখান। পরবর্তীতে চোরাকারবারিদের যোগসাজশে আলামত আত্মসাতের লক্ষ্যে দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী তোবারক হোসেন সরেজমিন যাচাই-বাছাই ছাড়াই একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন, যাতে ওসি মনির হোসেন স্বাক্ষর করে জালিয়াতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
পরবর্তীতে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানা জালিয়াতি আঁচ করতে পেরে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থানা কম্পাউন্ডে রাখা কাভার্ডভ্যানটি খুলে পুনরায় কম্বল গণনার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে পুনরায় গণনায় ৪৩০ পিসের স্থলে ৫৬০ পিস কম্বল পাওয়া যায়। অর্থাৎ, প্রায় ৪ লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ১৩০ পিস উন্নতমানের (BSSB Jannat Premium Mink Collection) কম্বল গায়েব করার সুপরিকল্পিত পাঁয়তারা করেছিল ওসির নেতৃত্বাধীন এই চক্র।
জালিয়াতি ধরা পড়ার পর গত ৯ মার্চ অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে আদালতে তলব করা হলে তারা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সার্বিক পর্যালোচনায় এই চরম অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে গত ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে (স্মারক নং- ৫৭) ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এসএমপি কমিশনারের কাছে নির্দেশ পাঠান আদালত। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক মাস সেই আদেশ ফাইলবন্দি করে রেখে অভিযুক্তদের রক্ষার চেষ্টা চালায় এসএমপি সদর দপ্তর।
দীর্ঘদিন ধরে আদালতের আদেশ অবজ্ঞা করার পর অবশেষে ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকায় ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত খবর (পর্ব নং- ০৬) প্রকাশের পর ওসি মনির হোসেনের প্রত্যাহারের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরই জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রধান হাতিয়ার। তবে সচেতন মহল মনে করেন, আলামত আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তি কেবল ‘প্রত্যাহার’ বা ‘পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত’ করা হতে পারে না।
ওসির প্রত্যাহারকে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ জানালেও, অবিলম্বে মামলার এজাহারকারী কর্মকর্তা জিতেন চন্দ্র দাশ এবং দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী তোবারক হোসেনসহ তিনজনের বিরুদ্ধেই দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সিলেটের সুশীল সমাজ। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের মূলোৎপাটন এখন সময়ের দাবি।