নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট নগরীতে এক ভয়ঙ্কর অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে রানা ভূঁইয়া নামের এক বহুরূপী প্রতারক। স্ত্রী ও সন্তান থাকার পরও দিনে-দুপুরে পুরুষ থেকে হিজড়া সেজে সে চালিয়ে যাচ্ছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সমকামিতার মতো ঘৃণ্য অপরাধ। তার এই অসাধু চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রকৃত হিজড়া সম্প্রদায়ও। দীর্ঘদিন ধরে এই মুখোশধারী অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও, প্রশাসন ও সুধীসমাজের নীরবতা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বান্দলাল আফিয়ার কোনা গ্রামের সন্তান রানা ভূঁইয়া বর্তমানে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কাশবনে (ইসলাম হোটেলের পেছনে) বসবাস করে। ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী-সন্তানের জনক রানা দিনের বেলায় শার্ট-প্যান্ট বা স্যুট পরে ভদ্রলোকের বেশে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু চাঁদাবাজির সময় হলেই শাড়ি পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে বনে যায় ‘হিজড়া’।
সিলেটের উঠতি বয়সের যুবকদের জোরপূর্বক হিজড়া সাজিয়ে রাস্তায় নামানো হচ্ছে। বিয়ে বাড়ি, বিয়ের গাড়ি, কমিউনিটি সেন্টার, বিমানবন্দর এলাকার যাত্রীদের গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তারা দলবদ্ধভাবে হানা দিচ্ছে। এমনকি কোনো বাড়িতে নবজাতক জন্মের খবর পেলেই এই ভুয়া হিজড়ার দল সেখানে গিয়ে জোরপূর্বক হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
রানা ভূঁইয়ার প্রতারণার শিকার খোদ প্রকৃত হিজড়ারাও। ‘সিলেট হিজড়া বাউল সংগঠন’ নামে একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে সে প্রকৃত হিজড়াদের বিয়ের অনুষ্ঠানে পাঠিয়ে টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করছে। ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর মেহেদি, রুমন, সুমি ও রাজু নামের চার হিজড়া সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন যে, রানা পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাদের দিয়ে টাকা আদায় করতো। পাওনা প্রায় ৫ লাখ টাকা ফেরত চাইলে রানা উল্টো তাদের অমানুষিক নির্যাতন করে।
শুধু তাই নয়, ২০১৯ সালে সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন সংস্থা থেকে হিজড়াদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য যেসব ফুডকার্ট বা ভ্যানগাড়ি দেওয়া হয়েছিল, রানা জোরপূর্বক সেগুলোও দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০টি এমন ভ্যানগাড়ি রানার দখলে, যা সে ক্বীন ব্রিজ ও কাজিরবাজার ব্রিজ এলাকায় চটপটি ব্যবসায়ীদের কাছে দৈনিক ভাড়ায় দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও দেখার কেউ নেই।
রানা ভূঁইয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি উন্মোচিত হয়েছে সুরমা মার্কেটের বিপরীত দিকে অবস্থিত জালালাবাদ পার্ক এলাকায়। সেখানে সে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া যুবকদের অর্থের প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে হিজড়া সাজিয়ে সমকামিতায় বাধ্য করছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর পার্কের সামনে এই নকল হিজড়াদের নিয়ে আড্ডা জমায় রানা, যা মূলত পুরুষ বিকিকিনির এক নগ্ন হাটে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি এই সিন্ডিকেট ওই এলাকায় মাদকের রমরমা বাণিজ্যও চালিয়ে যাচ্ছে।
রানার এই জঘন্য কর্মকাণ্ডে সিলেটের প্রকৃত হিজড়া সমাজ ফুঁসে উঠেছে। সিলেট বিভাগ হিজড়া কল্যাণ সংস্থার সভাপতি সুন্দরী হিজড়ার (গুরুমা) নেতৃত্বে প্রায় ৯০০ হিজড়া রানার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। সুন্দরীর স্পষ্ট দাবি, “রানা কোনো হিজড়া নয়, সে একজন সমকামী পুরুষ। তার কারণে সমাজে প্রকৃত হিজড়াদের সম্মান নষ্ট হচ্ছে।” ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সুন্দরী হিজড়া, আলেয়া, বিউটি, লিপি, সাজু, রানী ও পাখিসহ সংস্থার সদস্যরা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার বরাবর রানার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে থানা ও ডিবি পুলিশ জালালাবাদ পার্কে অভিযান চালালেও ধূর্ত রানা ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কোতোয়ালি থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হিজড়া শনাক্ত করার দায়িত্ব তাদের নয়, তবে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িতদের বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
আজ থেকে ৫ বছর আগেও সিলেটে এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজির চিত্র ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, সিলেটের সাবেক এক জেলা প্রশাসক হিজড়াবেশী এই চাঁদাবাজদের সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। বর্তমানে পত্রপত্রিকায় এসব খবর নিয়মিত প্রকাশিত হলেও সুশীল সমাজের নীরবতা রহস্যজনক।
সিলেটের সচেতন নাগরিক ও প্রকৃত হিজড়া সম্প্রদায় অবিলম্বে এই নকল হিজড়া তৈরির কারিগর ও গডফাদার রানা ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, সিসিক প্রশাসক এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ভয়ংকর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হচ্ছে। অন্যথায় সিলেটের সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম হুমকির মুখে পড়বে।