বিশেষ প্রতিবেদক: জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, ঠিক তখনই সিলেটের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অনলাইন মামলা সিস্টেমকে পাশ কাটিয়ে ‘ভুয়া রশীদ’ ছাপিয়ে দেদারসে চলছে পরিবহণ চাঁদাবাজি। এই অপকর্মের নেপথ্যে মূল হোতা হিসেবে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) শাহাব উদ্দিনের নাম উঠে এসেছে, যার সরাসরি নির্দেশনায় প্রতিটি সার্জেন্ট ও টিএসআইকে দৈনিক দশ হাজার টাকা আদায়ের টার্গেট দেওয়া হয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশ বিভাগে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বর্তমানে অনলাইন মামলার বিধান চালু রয়েছে। তবে নিয়মকানুন ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিলেট জেলা ট্রাফিক পুলিশ নিজস্ব তত্ত্বাবধানে জরিমানার ভুয়া বই তৈরি করেছে। সূত্রমতে, এই ভুয়া রশীদের মাধ্যমে সিলেট জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহন থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রতিদিন এই খাত থেকে গড়ে ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, টিআই শাহাব উদ্দিন প্রতিটি সার্জেন্ট ও টিএসআইয়ের ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছেন। দিন শেষে কে কত টাকা অবৈধভাবে আদায় করলেন, সেই হিসাব হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে টিআইয়ের কাছে পাঠাতে হয়। কালেকশন কম হলে সংশ্লিষ্ট সার্জেন্ট বা টিএসআইকে তিরস্কারের শিকার হতে হয়। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন সকালে টিআই তার ব্যক্তিগত মুন্সীর মাধ্যমে বার্তাও পাঠান, যাতে টার্গেট পূরণ করার তাগিদ দেওয়া হয়। তদারকির জন্য সার্জেন্টদের পেছনে সাদা পোশাকে নিজস্ব লোকও নিয়োগ করেছেন এই ইন্সপেক্টর।
একাধিক সূত্রের দাবি, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে খোদ সিলেট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, মাস শেষে আদায়কৃত টাকার একটি বড় অংশ—প্রায় ২০ লাখ টাকা—টিআই শাহাব উদ্দিন সরাসরি এসপি’র হাতে তুলে দেন। নেপথ্যের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুরে কর্মরত থাকাকালীন এসপি যাবের সাদেকের অধীনেই কাজ করতেন টিআই শাহাব উদ্দিন। এসপি সিলেটে বদলি হয়ে আসার পর টিআই শাহাব উদ্দিন ও তার পুরো বাহিনীকে সিলেটে নিয়ে আসেন এবং পুনরায় ‘গাজীপুর মডেলের’ হরিলুট শুরু করেন।
সিলেটের বিভিন্ন পরিবহন শ্রমিক ও মালিক সমিতির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ—জেলার প্রতিটি উপজেলা শহরের প্রবেশমুখে সার্জেন্টরা চেকপোস্টের নামে যানবাহন আটকিয়ে মামলা না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছেন। গতকাল জকিগঞ্জে এমনই এক অভিযানে মামলা না দিয়ে ৮৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সার্জেন্ট ও টিএসআই জানিয়েছেন, তারা এই চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে চাকরি রক্ষার খাতিরেই তারা এই অবৈধ কাজে অংশ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। টিআই শাহাব উদ্দিন নিজেই তার বিশ্বস্ত সহযোগী সার্জেন্ট দিনার আলী মুন্সীকে নিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে সরাসরি চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
সিলেট জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক গণমাধ্যমে বলেন, “৫ আগস্টের পর সিলেটে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা কার্যক্রম বন্ধ ছিল, আমি যোগদানের পর তা পুনরায় চালু করেছি। অনলাইনে পরিবর্তে হাতে লেখা রশীদে টাকা তোলার বিষয়টি জানা নেই। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি ড. জিল্লুর রহমান বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে গণমাধ্যমে জানান, “অভিযোগগুলো আমাদের নজরে এসেছে। পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবিলম্বে ট্রাফিক ব্যবস্থার এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের পকেট কাটার এই মহোৎসব বন্ধ করা কঠিন হবে।
Leave a Reply