বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট মহানগর কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অর্থ আদায় এবং পুনরায় পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জেল পুলিশ ইকবালের বিরুদ্ধে। আদালত থেকে বৈধভাবে জামিন পাওয়ার পরও বন্দিদের মুক্তি সহজ হচ্ছে না বলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহলে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘ ৬ মাস থেকে ১ বছর কারাভোগের পর বন্দিরা যখন মুক্তির আশায় জেল গেটে আসেন, তখন নতুন করে হয়রানি ও আতঙ্কের মুখোমুখি হন। কারাগার থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে জেল পুলিশ ইকবাল বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট থানায় তথ্য দিয়ে পুলিশ ডেকে এনে পুনরায় আটক করানোর হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে থানার পুলিশ এনে পুনরায় আটক বা নতুন মামলায় জড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের জামিন পাওয়ার পর এই হয়রানির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন ইকবাল। এছাড়া কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন অনিয়ম ও বন্দিদের ‘পিসি’ (প্রিজনার্স ক্যাশ) বাবদ অর্থ আত্মসাতের সঙ্গেও তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
জেল গেটের এই অনিয়মের শিকার হয়েছেন খোদ আইনজীবীরাও। সিলেট আদালতের এক আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি নিজেই ২ মাস জেল খেটে জামিনে বের হওয়ার সময় ইকবালকে ৬ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি। টাকা না দিলে নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল।”
আরেক ভুক্তভোগী নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমি গরিব মানুষ, তিন হাজার টাকা দিয়ে কাকুতি-মিনতি করে পার পেয়েছি। না হলে ইকবাল আমাকে আবার জেলে পাঠাতো।” তিনি আরও দাবি করেন, তার চোখের সামনেই টাকা দিতে না পারা অনেককে জেল গেট থেকে পুনরায় আটক করে নিয়ে গেছে পুলিশ।
অভিযুক্ত জেল পুলিশ ইকবালের গ্রামের বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার খাগাইল গ্রামে এবং বর্তমানে তিনি নগরীর মাতৃমঙ্গল এলাকায় বসবাস করছেন। প্রশাসনের নীরবতার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জেল পুলিশ ইকবাল সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে বলেন, এগুলো আগে হয়েছে, এখন না বলেই তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে সিলেট মহানগর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার জানান, তিনি ইকবালকে চিনলেও এসব অভিযোগের ব্যাপারে কিছু জানেন না। বিস্তারিত তথ্যের জন্য তিনি জেল সুপারের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, কারাগারের ডিআইজি (উপ-মহাপরিদর্শক) এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে বলেন, “অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের মতে, কারাগারের মতো সংবেদনশীল স্থানে দায়িত্ব পালনকারী কোনো সদস্যের এমন কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জামিনপ্রাপ্ত বন্দিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় আইনের শাসন ও মানবাধিকারের চরম পরিপন্থী। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় নাগরিকরা অবিলম্বে এই অর্থ বাণিজ্যের সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply