মোঃ রায়হান হোসেন:
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা ভূমি অফিস যেন পরিণত হয়েছে ঘুষ ও দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে। সরকারি এই সেবা কেন্দ্রে সেবা নিতে এসে পদে পদে হয়রানি, অনৈতিক অর্থ দাবি এবং চরম নাজেহাল হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এবার এই অফিসের নামজারি সহকারী অসিম চন্দ্রের বিরুদ্ধে ঘুষের ৬০ হাজার টাকা ও জমির মূল দলিলপত্র আত্মসাৎ করার চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। কেবল তাই নয়, দাবিকৃত অতিরিক্ত ঘুষ না দেওয়ায় আবেদন বাতিল এবং টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীকে মধ্যরাত পর্যন্ত অফিসে আটকে রেখে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ৪, ৬ ও ৭ জুন (২০২৬) তারিখে যথাক্রমে সিলেটের জেলা প্রশাসক, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী মোঃ দেলোয়ার হোসেন। তিনি উপজেলার নিয়াগুল গ্রামের বাসিন্দা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন তার নিজের কেনা ২ শতক বাড়ীর ভূমিসহ মামা আব্দুস সালাম, মৃত চাচা শ্বশুর জয়নাল আবেদীন এবং মামাতো ভাই মুনজুর আলমের নামে মোট ৪টি নামজারির আবেদন করেন। আবেদনগুলোর মামলা নম্বর হলো- ৪৬/২০২৪-২৫, ৫২৮/২০২৪-২৫, ৫৭৮/২০২৪-২৫ ও ৪৪৩৪/২০২৩-২৪। এই কাজ দ্রুত অনুমোদনের প্রলোভন দেখিয়ে নামজারি সহকারী অসিম চন্দ্র ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মূল দলিলাদিসহ নগদ ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) টাকা হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে ভূমির ধরন ‘বাড়ী রকম’ হওয়ার খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আরও ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা আদায় করেন।
সর্বমোট ৬০ হাজার টাকা পকেটে ভরার পরও নামজারির কোনো কাজ করেননি অসিম চন্দ্র। দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর একপর্যায়ে ‘দলিলে ভুল আছে’ এমন বানোয়াট কথা বলে নতুন করে আরও ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন এই অন্যায় ও অযৌক্তিক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, ক্ষিপ্ত হয়ে অসিম চন্দ্র সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তার নামজারি আবেদনগুলো বাতিল করে দেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলেন, “টাকা না দেওয়ার কারণে নামজারি বাতিল হয়েছে, এতে আমার কিছু করার নাই।”
কাজ না হওয়ায় ভুক্তভোগী যখন তার দেওয়া ঘুষের টাকা ও জমির মূল দলিল ফেরত চান, তখন শুরু হয় আরেক দফা অমানবিক হয়রানি। গত ২ মার্চ (২০২৬) তারিখে টাকা ও দলিল ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুক্তভোগীকে রাত ১টা পর্যন্ত ভূমি অফিসের বারান্দায় অপেক্ষায় রাখা হয়। এরপর টাকা বা দলিল কিছুই না দিয়ে উল্টো এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) মহোদয়কে ব্যবহার করে তাকে অফিস থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। এই চরম অন্যায় ও দুর্নীতির বিষয়টি এসি ল্যান্ডকে জানানোর কথা বললে অসিম চন্দ্র মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। তিনি ভুক্তভোগীকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে বলেন, “এসিল্যান্ড মহোদয়কে জানালে অফিসের সীমানার মধ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না এবং বিভিন্ন বানোয়াট কার্যকলাপে জড়িয়ে চরমভাবে হেনস্তা করা হবে।”
ভূমি অফিসের একজন সাধারণ সহকারীর এমন মাফিয়া স্টাইলের হুমকিতে বর্তমানে ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন তার টাকা ও জমির মূল দলিল হারিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। নিরুপায় হয়ে তিনি টাকা ও দলিল উদ্ধারের পাশাপাশি এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত প্রার্থনা জানিয়েছেন।
ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া ঠেকাতে অভিযোগের অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট কার্যালয়, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং সিলেট প্রেসক্লাব বরাবরও পাঠানো হয়েছে। সরকারি চেয়ারে বসে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজির ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুর্নীতির সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন প্রশাসন এই বেপরোয়া কর্মচারীর বিরুদ্ধে কী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
Leave a Reply