অস্বচ্ছতার অবসান নাকি নতুন টানাপোড়েনের সূত্রপাত? | তদন্ত রিপোর্ট

রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৭ অপরাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

অস্বচ্ছতার অবসান নাকি নতুন টানাপোড়েনের সূত্রপাত?

অস্বচ্ছতার অবসান নাকি নতুন টানাপোড়েনের সূত্রপাত?

Manual2 Ad Code

মোঃ রায়হান হোসেন: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা চিরাচরিত প্রথার আড়ালে পুঞ্জীভূত বিপুল অর্থের গন্তব্য ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিলেটসহ দেশজুড়ে তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমিতে পুণ্যার্থীদের ভক্তি ও অনুরাগের নিদর্শনস্বরূপ প্রদত্ত দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসনের অভাবনীয় ও যুগান্তকারী হস্তক্ষেপে উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত সতেরো লক্ষাধিক টাকার বিপুল খতিয়ান একদিকে যেমন জনমনে বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে, অন্যদিকে জন্ম দিয়েছে মাজারের দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীনতার অভিযোগ। সম্প্রতি সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গৃহীত হয়। মাজার প্রাঙ্গণে স্থাপিত দানের জন্য ব্যবহৃত তিনটি বিশালাকার ডেগ সিলগালা করে একটি নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। তৎপরবর্তী সময়ে, মাজারের সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে দানবাক্স ও ডেগ উন্মুক্ত করে প্রকাশ্য অর্থ গণনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

Manual1 Ad Code

মাত্র চার দিনের ব্যবধানে সংগৃহীত হয়েছে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা। নগদ অর্থের পাশাপাশি মিলেছে ৭ আনা স্বর্ণালংকার এবং বিবিধ বৈদেশিক মুদ্রা। এই বিপুল ধনরাশি প্রাপ্তির পর মাজারের মাসিক ও বার্ষিক আয়ের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কৌতূহল ও প্রশ্নের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন জানিয়েছেন, মাজারের এই অর্থ সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যে সোনালী ব্যাংকে একটি স্বতন্ত্র হিসাব খোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও ওয়াকফ ইন্সপেক্টরের যৌথ সমন্বয়ে আগামী এক মাস এই আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষিত হবে। তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেছে মাজারের চিরাচরিত ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেম সম্প্রদায়।

মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্নার ভাষ্যমতে, মাজারের এই সম্পদ কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গীদের উত্তরাধিকার হিসেবে প্রায় ৩০০টি পরিবার ‘বাড়ি প্রথা’র মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় এই মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। মাজারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত অর্থ তারা ঐতিহ্যগত অধিকার বলে ‘হাদিয়া’ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। মাজারভক্তদের সংগঠন ‘আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান জামান চৌধুরীও অভিযোগ করেছেন, এই ব্যাংক হিসাব বা অর্থ ব্যবস্থাপনার কোনো স্তরেই মাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

Manual6 Ad Code

মাজার কর্তৃপক্ষের দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের যাবতীয় মাজার, ঈদগাহ ও কবরস্থান ‘বাই ডিফল্ট’ ওয়াকফ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারটি ‘ওয়াকফ ফি লিল্লাহ’ (আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান), ‘ওয়াকফ আলাল আওলাদ’ (উত্তরাধিকারীদের জন্য অংশ) এবং ‘ব্যবহারিক ওয়াকফ’—এই তিন ক্যাটাগরিতেই আইনত নিবন্ধিত ও পরিগণিত।

Manual4 Ad Code

মাজারের দানবাক্সে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাত্র দু’দিনের মাথায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আকস্মিক প্রজ্ঞাপনে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও এই বদলির সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তথাপি মাজার ইস্যুর সাথে এর কাকতালীয় সংযোগ জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বদলি হওয়া জেলা প্রশাসককে পুনর্বহালের দাবিতে সিলেটে নাগরিক সমাজের আন্দোলন চলমান রয়েছে। নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কিমের মতে, প্রশাসনের সাম্প্রতিক এই উদ্যোগ মাজার অনুসারী এবং কওমি ঘরানার মানুষের মাঝে এক মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ ও মুখোমুখি অবস্থানের সৃষ্টি করেছে।
তবে সরকারের উচ্চমহল এই আর্থিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

Manual1 Ad Code

সিলেট সফরে এসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিদায়ী জেলা প্রশাসকের ভূয়সী প্রশংসা করে সুস্পষ্টভাবে বলেন, “তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন।” মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যেকোনো মূল্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে মন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, পুণ্যভূমির এই ঐতিহাসিক মাজারের দানবাক্সকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই জটিল সমীকরণ এখন আর কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। চিরাচরিত প্রথার ধারাবাহিকতা বনাম আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিধিবদ্ধ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার এই দ্বন্দ্বে চূড়ান্ত ও টেকসই সমাধান কোন পথে আসবে, তা এখন সমগ্র দেশবাসীর অন্যতম আলোচনার বিষয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code