বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট বিভাগের অন্যতম সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মূখ্য চিকিৎসা-সরঞ্জামের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষত, রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের উচ্চমাত্রার এমআরআই (MRI) ও সিটি স্ক্যান (CT Scan) যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে থাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা হতদরিদ্র ও প্রান্তিক রোগীরা।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ৯০০ শয্যার ক্ষমতাসম্পন্ন এই আঞ্চলিক রেফারাল হাসপাতালে প্রতিদিন সিলেট বিভাগের চার জেলা ছাড়াও সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা থেকে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির আশায় ভিড় জমান। বিশেষ করে নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিক্স, ট্রমাটোলজি এবং মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়া গুরুতর রোগীদের মাথার আঘাত, মস্তিস্কের জটিলতা, স্নায়ুবিক গোলযোগ কিংবা অস্থিভঙ্গের সঠিক নির্ণয়ে নিয়মিত এমআরআই এবং সিটি স্ক্যানের প্রয়োজন হয়। অথচ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এসব অতি-জরুরি পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। পরীক্ষা করাতে যাওয়া ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের স্বজনদের কেবল জানানো হচ্ছে, “মেশিন বিকল, কবে মেরামত হবে তা অনিশ্চিত।”
সরকারি এই হাসপাতালে যেখানে মাত্র ৩ হাজার টাকায় এমআরআই সেবা পাওয়ার কথা, সেখানে যান্ত্রিক বিকলতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। যেখানে একই পরীক্ষার জন্য গুণতে হচ্ছে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা—যা দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সামর্থ্যের একেবারে বাইরে। জীবন রক্ষার্থে অনেকে নিঃস্ব হয়ে, জমিজমা কিংবা গবাদিপশু বিক্রি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রসঙ্গতঃ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই রেডিওলজি বিভাগে আধুনিক এমআরআই প্রযুক্তির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবলের অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেবা চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রযুক্তিগত ধস নামে। প্রয়োজনের তুলনায় সরঞ্জামের চরম স্বল্পতা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে না পারায় যন্ত্রাংশগুলো দ্রুত কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার যেখানে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ও প্রযুক্তিগত সংকটের মারপ্যাঁচে বন্দি, সেখানে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ক্ষোভ জমছে ভুক্তভোগী জনসাধারণের মাঝে। অনতিবিলম্বে বিকল যন্ত্রপাতি মেরামত, নতুন আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল নিয়োগের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসন করা না হলে বৃহত্তর সিলেটের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
Leave a Reply