পটপরিবর্তনে সিলেটে নতুন চোরাচালানচক্র: নেপথ্যে কারা? | তদন্ত রিপোর্ট

বৃহস্পতিবার, ৩০ Jul ২০২৬, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন

পটপরিবর্তনে সিলেটে নতুন চোরাচালানচক্র: নেপথ্যে কারা?

পটপরিবর্তনে সিলেটে নতুন চোরাচালানচক্র: নেপথ্যে কারা?

Manual8 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৌশলগত ও ভূ-রাজনীতিগতভাবে স্পর্শকাতর সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ চোরাচালান সাম্রাজ্যের চাবিকাঠি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। উত্তর-পূর্ব সীমান্তের গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তজুড়ে যে অপরাধ সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এতদিন শাসকদল আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের হাতে কুক্ষিগত ছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর তা রাতারাতি স্থানান্তরিত হয়ে বিরোধী দল বিএনপির স্থানীয় বলয়ের পকেটে চলে গেছে। ক্ষমতার এই দৃশ্যমান হস্তান্তরের পর পুরো সীমান্তজুড়ে গড়ে উঠেছে এক নজিরবিহীন অরাজকতা ও অপরাধের সমান্তরাল নেটওয়ার্ক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে এই সীমান্ত সাম্রাজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক বা ‘গডফাদার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ফতেপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ। স্থানীয় তথ্যাভিজ্ঞ মহল ও প্রবীণ অধিবাসীদের মতে, দলীয় এক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ রাজনৈতিক ছায়াতলে থেকে রশিদ দিনে দিনে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। জৈন্তাপুরস্থ আব্দুর রশিদের নিজ বাসভবনের অভ্যন্তরেই গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিশাল, দুর্ভেদ্য ও গোপন আস্তানা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গভীর রাত নামলেই সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ভারতীয় চোরাই চিনি, জিরা, মূল্যবান কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্যের একের পর এক কন্টেইনার ও ট্রাক বহর সরাসরি এই আস্তানায় প্রবেশ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো অভিযানের উদ্যোগ নিলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। সামান্যতম আইনি পদক্ষেপের আভাস পেলেই মুহূর্তের মধ্যে শত শত সশস্ত্র অনুসারী সেখানে মহড়া দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চড়াও হয়। উল্লেখ্য, গত বছর ভারতীয় গরু আটক করাকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌম সশস্ত্র বাহিনী সেনাবাহিনীর ওপর সংঘটিত সশস্ত্র হামলার ঘটনারও অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ও এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন এই রশিদ।

এই অপরাধ সিন্ডিকেটের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় রশিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন জৈন্তাপুরের তারিকুল, ফারহান, বহুল আলোচিত কালা ওরফে কালু এবং আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মনসুর মেম্বার। যদিও নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যাবতীয় অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে মনসুর মেম্বার একে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অপরদিকে, মূল অভিযুক্ত আব্দুর রশিদ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় জানান, “সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে আমরা আমাদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” সিলেটের সীমান্তবর্তী হরিপুর রুটটি বর্তমানে ভারতীয় অবৈধ পণ্যের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট ও করিডোরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আংশিক অভিযান ও সামান্য মালামাল জব্দের খবর প্রচারিত হলেও, দিনশেষে রাত নামলেই সীমান্তজুড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সুসংগঠিত চক্র।

Manual6 Ad Code

অনুসন্ধানী তথ্যে বেরিয়ে এসেছে, এই নেটওয়ার্কের নেপথ্যে মাঠপর্যায়ে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে হরিপুরের চিহ্নিত চোরাকারবারি মঈনুল, ওয়েস, লোকমান ও রুবেল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এরা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল ও রাহেল সিরাজের ছত্রচ্ছায়ায় অবাধে সীমান্ত অপরাধ পরিচালনা করতো। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে কৌশল বদলে এরা সিলেট বিএনপি ও ছাত্রদলের দুই প্রভাবশালী নেতাকে নতুন ‘লাইনম্যান’ হিসেবে নিযুক্ত করে নিজেদের রুট নির্বিঘ্নে সচল রেখেছে। সীমান্ত পার করে আনা ভারতীয় জিরা, প্রসাধনী, চকলেট, মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বিপুল পরিমাণ প্রাণঘাতী মাদকের চালান সিলেট নগরীর ব্যস্ততম তামাবিল-টিলাগড় সড়ক ব্যবহার করে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ জেলাগুলোতে। গভীর রাতে ছোট পিকআপ, মিনি ট্রাক ও লোকাল গণপরিবহনের মাধ্যমে হরিপুর থেকে সিলেটের টিলাগড় হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক এবং শেরপুর সেতু এলাকা পর্যন্ত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সুবিন্যস্ত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। টিলাগড় এলাকার এক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “প্রতি রাত ২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত এই সড়ক দিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক গতিতে পিকআপ ও মিনি ট্রাক চলাচল করে। এসব গাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামনে-পিছনে সশস্ত্র মোটরসাইকেল স্কোয়াড ও প্রাইভেট কার দিয়ে কড়া মহড়া দেওয়া হয়।”

পণ্য পরিবহন ও রুট নিরাপদ রাখার অজুহাতে প্রতিটি যান থেকে নির্দিষ্ট হারে মোটাদাগে চাঁদা আদায় করা হয়। সংগৃহীত এই বিপুল অর্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে বিকাশসহ বিভিন্ন ডিজিটাল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে মূল হোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। তদুপরি, হরিপুর রুট জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে চক্রটি গ্রহণ করেছে চরম চতুর ও অভিনব পন্থা। বড় কোনো কার্টন বা সন্দেহজনক বস্তার পরিবর্তে বিপুল পরিমাণ নামী-দামী ব্র্যান্ডের কসমেটিকস ও দামি শাড়ি সাধারণ শপিং ব্যাগে ভরে সাধারণ ক্রেতা বা দূরপাল্লার যাত্রীর ছদ্মবেশে পরিবহন করা হচ্ছে। ছদ্মবেশী এই কৌশলে হরিপুর থেকে অনায়াসেই হাজার হাজার চালানের ভারতীয় পণ্য সরাসরি সিলেট নগরীর লালাদিঘীর পাড়, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমানে লালাদিঘীর পাড় এলাকার নির্দিষ্ট কিছু গোপন গোডাউন ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এসব পণ্য ছড়িয়ে পড়ছে নগরীর খুচরা বাজারগুলোতে। এই প্রক্রিয়ায় হরিপুর রুটের অপরাপর তিন প্রভাবশালী গডফাদার- এয়াহিয়া, নুরুল এবং আমিন মোল্লার নাম প্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাদের নিজস্ব শক্তিশালী তথ্য সংগ্রহকারী নেটওয়ার্ক বা ‘লাইনম্যান’দের মাধ্যমে মহাসড়ক ও বিভিন্ন চেকপোস্টের আগাম খবর চোরাকারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়, যার ফলে প্রশাসনিক চেকপোস্ট বহাল থাকা সত্ত্বেও অবৈধ পণ্যের প্রবাহ ব্যাহত হয় না।

Manual5 Ad Code

রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দলের নাম জড়ানোয় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সিলেট জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব। জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, “আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট ও কঠোর নির্দেশ রয়েছে- দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে কোনো প্রকার অপকর্ম বরদাশত করা হবে না। এসকল অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেবল চুনোপুটি বা বাহকদের ধরলে চলবে না, চোরাচালানের মূল অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের সরাসরি আইনের আওতায় আনতে হবে।”

সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনি সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী জাবের সাদেক গণমাধ্যমে বলেন, “সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে- তাতে কোনো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবে ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে শতভাগ বন্ধ করা আমাদের একার পক্ষে প্রায় অসম্ভব, তথাপি আমরা সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মফিজুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, “চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশের নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত ও মহাসড়কে আমাদের নজরদারি এবং যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।”

Manual8 Ad Code

সম্প্রতি সিলেটে আয়োজিত এক প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে সীমান্ত পরিস্থিতির এই ভয়াবহতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “চোরাচালানচক্রকে আর কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ছাড় দেওয়া হবে না। জুলাইয়ের মধ্যে যারা নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে গুটিয়ে নেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

Manual5 Ad Code

সীমান্ত জুড়ে চলমান এই বিশৃঙ্খলা, রাজস্ব ফাঁকি এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম অবক্ষয়ে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। সীমান্ত রুটগুলো পুরোপুরি চোরাচালানমুক্ত করতে এবং আব্দুর রশিদ, মঈনুল, ওয়েস, লোকমান ও রুবেল, এয়াহিয়া, নুরুল ও আমিন মোল্লার মতো চিহ্নিত গডফাদারদের দ্রুত গ্রেফতার করতে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে এক যৌথ ও ক্র্যাশ অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছে সিলেটের সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code
error: Content is protected !!