নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র বিছানাকান্দি এখন পাথরখেকো সিন্ডিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি খাস জমির ভুয়া মালিকানা দাবি করে অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে সেখানে চলছে অবাধে পাথর লুট। আর পরিবেশ বিধ্বংসী এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রকাশ্যে মদদ দেওয়ার ও ভাগবাটোয়ারা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র ও সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বিছানাকান্দি গ্রামের যুবলীগ ক্যাডার পরিচয়ধারী জয়নাল (পিতা: ছয়দুর রহমান), আফজাল (পিতা: মাতাবুর রহমান) এবং মাসুম আহমদ (পিতা: মহিবুর রহমান) এই বিশাল চাঁদাবাজি ও পাথর লুটের মূল হোতা। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি খাস জায়গার ভুয়া মালিক সেজে ৩ হাজার ঘনফুট ধারণক্ষমতার প্রতিটি বাল্কহেড বা নৌকা থেকে ‘জায়গার ভাড়া’ বাবদ ১ লাখ টাকা করে অবৈধ চাঁদা আদায় করছে।
লুটপাটের এখানেই শেষ নয়। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বিট অফিসার এসআই অমিত সিংহ প্রতিটি নৌকা থেকে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা নিচ্ছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, খোদ গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীকে ম্যানেজ করেই দিনের আলোতে এই তান্ডব চালানো হচ্ছে বলে প্রকাশ্যে আস্ফালন করছে অভিযুক্ত জয়নাল, আফজাল ও মাসুম।
এলাকাবাসীর দাবি, জায়গা বাবদ আদায়কৃত টাকার একটি বড় অংশ টাকা ইউএনও-র পকেটে যায় বলেই তিনি সব দেখেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছেন।
সরজমিন তদন্তে এবং স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অবৈধ ও পরিবেশ বিধ্বংসী দানবযন্ত্র ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে দেদারসে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকায় চলে এই ধ্বংসযজ্ঞ।
হিসাব কষলে দেখা যায়, প্রতিদিন যদি এত সংখ্যক নৌকা থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়, তবে তা প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের কোটি টাকার চাঁদাবাজির এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সরজমিন স্পষ্ট দেখা যায়, কীভাবে প্রকাশ্যে একাধিক শক্তিশালী পাম্প বা বোমা মেশিন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ক্ষতবিক্ষত করে পাথর ও বালু তোলা হচ্ছে।
অপরিকল্পিত ও অবৈধ এই পাথর উত্তোলনের ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বিছানাকান্দি পর্যটন কেন্দ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নদীভাঙন ও ভূমিধসের কবলে পড়ে বিলীন হতে বসেছে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও খেলার মাঠ।
অভিযুক্ত জয়নাল, আফজাল ও মাসুমকে ফোন করা হলে তিন জনের কেউই রিসিভ করেননি, তাই তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নৌকা থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের বিষয়ে সোমবার বিকেলে বিট অফিসার এসআই অমিত সিংহের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ওই জায়গাগুলো ইজারা দেওয়া আছে। তবে ইজারা শুধু বাদেবাসা বালুমহালের জন্য, তাহলে বিছানাকান্দিতে কীভাবে পাথর উত্তোলন হচ্ছে—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। বরং “খবর পেয়েই অভিযান চালিয়ে সব বন্ধ করে দিয়েছি” বলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। তবে এসব জানতে গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুক মোড়লকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি, তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সোমবার বিকেলে গোয়াইনঘাটের ইউএনও রতন কুমার অধিকারীকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি, তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই পরিবেশ বিধ্বংসী তান্ডব ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজির হাত থেকে বিছানাকান্দির অস্তিত্ব রক্ষা করতে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশের বিভাগীয় রেঞ্জ ডিআইজি ও এসপি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও সচেতন মহল। প্রশাসন এখনই কঠোর না হলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে বিছানাকান্দির অপার সৌন্দর্য।
Leave a Reply