বিশেষ প্রতিবেদক: ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি সিলেটে ঐতিহ্যবাহী পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ভেতরে গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ একটি অশুভ বলয়ের বিরুদ্ধে সীমান্তঘেঁষা চোরাচালান বাণিজ্য একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক আধিপত্য বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপের আশা করা হলেও, বাস্তবে এই ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ সিন্ডিকেটের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অপরাধ চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ সচেতন মহল ও পুলিশি সূত্রের।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসএমপির অভ্যন্তরীণ রদবদল, পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে জিম্মি করে ফেলেছে এই ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ বলয়টি। এই নেটওয়ার্ক ও প্রভাব বিস্তারের নেপথ্য কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে পুলিশ কর্মকর্তা সৌমেন মিত্রের দিকে। ইতিপূর্বে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরবর্তীতে বিমানবন্দর (এয়ারপোর্ট) থানার ওসি (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই কর্মকর্তা বর্তমানে কমিশনার কার্যালয়ে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনার কার্যালয়ের চেয়ারে বসেই তিনি নিজের অনুগত ক্যাডারদের মাধ্যমে সিলেটের গোটা চোরাচালান সাম্রাজ্য ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নেপথ্যে থেকে পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ মতে, পুলিশ কর্মকর্তা সৌমেন মিত্রের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এসএমপিতে গড়ে উঠেছে ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারীদের’ এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই বলয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যেসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে তাঁরা হলেন- কোতোয়ালি মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার অনূপ কুমার, এয়ারপোর্ট থানার সেকেন্ড অফিসার স্বপন কুমার তালুকদার, সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) এসআই শিপলু চৌধুরী, লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির টু-আইসি এসআই সুমন মন্ডল, শাহপরাণ (রহ.) থানার এসআই জয়ন্ত এবং মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশে কর্মরত চার এসআই- পলাশ কানু, বুলবুল বিশ্বাস, অঞ্জন ও রাজেত। ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ সিন্ডিকেটের অভিযোগকৃত প্রতিটি সদস্যের মূল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছেন সৌমেন মিত্র।
সিলেটের চোরাচালান রুটের নিখুঁত বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ সিন্ডিকেটের হাত ধরে সীমান্ত অঞ্চল থেকে আসা চোরাই পণ্যের রুটগুলো নিরাপদ করিডোরে পরিণত হয়েছে। সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক দিয়ে আসা ভারতীয় অবৈধ পণ্যের চালানগুলো শাহপরাণ থানার এসআই জয়ন্তের তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স’ নিয়ে নাইওরপুল ও সোবহানীঘাট ফাঁড়ির সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে কালীঘাট পাইকারি বাজারে প্রবেশ করে। এই পুরো রুটের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন সোবহানীঘাট ফাঁড়ির আইসি এসআই শিপলু চৌধুরী।
অন্যদিকে, এয়ারপোর্ট সড়ক দিয়ে আসা চোরাই পণ্যের গাড়িগুলো এয়ারপোর্ট থানার সেকেন্ড অফিসার স্বপন কুমার তালুকদারের তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স’ নিয়ে লামাবাজার ফাঁড়ি ও বন্দরবাজার হয়ে কালীঘাটে পৌঁছায়। এই করিডোর সচল রাখা ও তদারকির দায়িত্বে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার অনূপ কুমার এবং লামাবাজার ফাঁড়ির টু-আইসি এসআই সুমন মন্ডল।
শুধু পথ সুগম করাই নয়, এই অবৈধ সীমান্ত বাণিজ্যের অর্থ উত্তোলনেও জড়িয়েছে ডিবি পুলিশের নাম। অভিযোগ রয়েছে, সৌমেন মিত্রের সাথে যোগসাজশে মহানগর ডিবির নামে নির্ধারিত হারে গাড়ি প্রতিও চাঁদা আদায় করেন ডিবিতে কর্মরত চার এসআই—পলাশ কানু, বুলবুল বিশ্বাস, অঞ্জন ও রাজেত।
এসব বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সৌমেন মিত্রের ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কৌশলে অভিযোগের ব্যাপার এড়িয়ে গিয়ে জানান- ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ বলতে কি তিনি তা জানেন না, প্রতিবেদকের মারফতে এই প্রথম শুনলেন, আর বলয় সৃষ্টি নাকি বহুদূর তিনি পূজা দিতেও কখনো মন্দিরে গিয়েছেন মর্মেও তার মনে হয় না।
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে এমন অপরাধচক্র ও সাম্প্রদায়িক তকমাযুক্ত প্রশাসনিক বলয় সক্রিয় থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ। তাঁদের মতে, গুটিকয়েক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ও চোরাকারবারিদের তোষণের কারণে ঐতিহ্যবাহী পুলিশ বাহিনীর সুনাম ধূলিসাৎ হতে বসেছে। অনতিবিলম্বে এই ‘গৌড়গোবিন্দ অনুসারী’ সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
Leave a Reply