বিশেষ সংবাদদাতা: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি মালামাল আত্মসাৎ, দাপ্তরিক নথি জালিয়াতি এবং অধীনস্থ সদস্যদের ওপর নির্মম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর সীমাহীন প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও অসংবেদনশীল আচরণের নির্মম বলিকাতে দুই নবজাতক সন্তানের ট্র্যাজিক মৃত্যুর অভিযোগ মিলেছে। খোদ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলেও অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জিআর মামলা নম্বর ০৫/২৬-এর জব্দকৃত মালামাল হিসেবে উদ্ধার হওয়া ৫৬০ পিস কম্বলের মধ্যে ১৩০ পিস কম্বল আত্মসাৎ করেন ওসি মনির হোসেন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা। এই চুরি ও জালিয়াতি আড়াল করতে তিনি দাপ্তরিক নথিতে ৪৩০ পিস কম্বল দেখিয়ে আদালতে ভুয়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন—যা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
প্রশাসনিক এই জালিয়াতির পাশাপাশি ওসির নিষ্ঠুর প্রশাসনিক মানসিকতার চরম শিকার হয়েছেন থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা। সম্প্রতি মোগলাবাজার থানায় কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর কনস্টেবল মামুনের স্ত্রী মারাত্মক গর্ভকালীন জটিলতায় পড়লে এসএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁর ৫ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেন। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ওসি মনির হোসেন তাঁকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানান।
গত ১৬ জুন সকালে ওই কনস্টেবলের স্ত্রীর তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে ওসির কক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওসি অত্যন্ত উগ্র ও অসংবেদনশীল ভাষায় বলেন, “আগে ভিভিআইপি ডিউটি, তারপর ছুটি। হাসপাতালে কি আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে যে আপনি গেলে আজরাইল চলে যাবে?” পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ছুটি মিললেও ততক্ষণে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। যথাসময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় পথেই জন্ম নেওয়া দুই প্রসূতি নবজাতক (এক পুত্র ও এক কন্যা) চিকিৎসাভাবাবে একে একে মৃত্যুবরণ করে।
এর আগেও গুরুতর অসুস্থ ড্রাইভার কনস্টেবল মোঃ মতিন মিয়াকে চিকিৎসা ছুটি না দেওয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সহকর্মীর এই অকালমৃত্যুতে সমবেদনা জানানো তো দূরের কথা, ওসির মন্তব্য ছিল, “একজন ড্রাইভার মারা গেছে তো কী হয়েছে, আরেকজন আসবে।”
এছাড়া গত এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে কনস্টেবল সাইফুল ইসলাম, এসআই শিহাব, এএসআই জয়নাল এবং ড্রাইভার কনস্টেবল সুশান্তকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, শারীরিক লাঞ্ছনার চেষ্টা ও চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। নিগ্রহের শিকার ড্রাইভার সুশান্ত প্রতিকার চেয়ে সিলেট পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে ইতিমধ্যে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় যেখানে তাৎক্ষণিক দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা কাম্য, সেখানে ওসি মনিরের বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ এবং দুই নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর তথ্য-প্রমাণ জমা হওয়া সত্ত্বেও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয় থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বাহিনীর অভ্যন্তরে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার এত বড় অপরাধ ও চরম অপেশাদারিত্বের পরও কেন কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি? সহকর্মীদের জীবন ও সরকারি মালামাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই ওসির বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি উঠেছে।
Leave a Reply