সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন মেগা প্রকল্পে হরিলুট! – তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন মেগা প্রকল্পে হরিলুট!

সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন মেগা প্রকল্পে হরিলুট!

নিজস্ব প্রতিবেদক: ছাতক ও সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। ভুয়া বিল উত্তোলন, সরকারি মালামাল আত্মসাৎ এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরকে বদলি করা হলেও, মূল অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচিত প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন। কাগজে-কলমে কাজ, বাস্তবে গায়েব মালামাল, এতে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বনাথ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে রীতিমতো হরিলুট চলছে। পুরনো বিদ্যুৎ লাইন সংস্কার এবং নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে কোনো কাজ না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত তামার কেবল, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ক্রস-আর্ম, রেকসহ মূল্যবান সরঞ্জাম আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি খুঁটি স্থাপনের কথা থাকলেও তার বড় অংশই এখনো সিলেট-সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ সড়কের বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মালামাল একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয় ও স্টোরে ফেরত দেখিয়ে ভুয়া বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে ছাতকে একই প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিল ছাড়ের নামে বড় অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিটি ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
প্রকল্পের অধীনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের রাউলী এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন। অথচ একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন এবং আংশিক কাজ করে পূর্ণাঙ্গ বিল তুলে নেওয়ার মতো গুরুতর দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে সাধারণ গ্রাহকদের চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সংযোগ দেওয়ার কথা বলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগে একটি চাঁদাবাজি মামলাও দায়ের হয়েছিল, যা পরবর্তীতে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে জানা যায়। এসব পাহাড়সম অনিয়মের বিষয়ে সেবুল নামে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সচেতন মহলের দাবি, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের সব ব্যয়, টেন্ডার এবং মালামাল ব্যবস্থাপনার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া দায় এড়িয়ে বলেন, সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন।” অন্যদিকে, বদলিকৃত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকায় অবস্থানরত প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর অভিযোগের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ সুবিধা না পাওয়ায় এবং এমন মেগা দুর্নীতি সামনে আসায়, এই প্রকল্প এখন সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo