সিলেটে নারীর সাজে হিজড়া, বিয়ের আড়ালে বাণিজ্য: সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস! – তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৫ পূর্বাহ্ন

সিলেটে নারীর সাজে হিজড়া, বিয়ের আড়ালে বাণিজ্য: সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস!

সিলেটে নারীর সাজে হিজড়া, বিয়ের আড়ালে বাণিজ্য: সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস!

মোঃ রায়হান হোসেন: আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটের পাঠানটুলা সংলগ্ন কুরবানটিলা এলাকা, যা স্থানীয়ভাবে ‘কুত্তামারা’ নামে পরিচিত, বর্তমানে এক বিভীষিকাময় অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে আধুনিক রূপসজ্জার নিপুণ কারুকার্যে একদল হিজড়াকে ‘মোহিনী নারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে গড়ে তোলা হয়েছে এক অভিনব বিয়ে বাণিজ্য সিন্ডিকেট’। এই চক্রের মূল লক্ষ্যবস্তু বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো সহজ-সরল রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। বিয়ের পবিত্র বন্ধনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যপ্রণালী ও সদস্যদের পরিচয় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রোমহর্ষক সব তথ্য।

অপরাধের রূপরেখা ও তদন্তে জানা গেছে: এই চক্রটি শিকার ধরতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে টিকটক ও ফেসবুককে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। চক্রের নারী সদস্যরা (তাহমিনা জান্নাত সাথি ও নাজমা বেগম) হিজড়াদের অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আধুনিক মেকআপ ও লেবাসে সজ্জিত করে জনৈক ‘সুন্দরী তন্বী’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রণয়ের সম্পর্ক যখন বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত গড়ায়, তখন শুরু হয় মূল ট্র্যাজেডি। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে ঘটা করে বিয়ে সম্পন্ন করার পর বাসর রাতে যখন স্ত্রীর প্রকৃত লিঙ্গ পরিচয় উন্মোচিত হয়, তখন ভুক্তভোগী প্রবাসীরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। প্রতিবাদ করতে গেলেই শুরু হয় চক্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের তাণ্ডব—যাকে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাইকোলজিক্যাল ব্ল্যাকমেইলিং’ বলা হয়।

অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে ১১ সদস্যের নিশ্ছিদ্র বলয়: অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই চক্রের মাস্টারমাইন্ড খাইরুল আলম সবুজ, যিনি এলাকায় ‘কসাই সবুজ’ নামে পরিচিত। পুরো সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা ও অর্থ বণ্টন তার ইশারায় হয়। জিহাদ আহমেদ নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখান, আর কসাই মান্নান নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের ভুয়া মামলার জালে অবরুদ্ধ করেন। কসাই মানিক, ফারুক আহমেদ, রাজমিস্ত্রি বাাসিত আলী ও ময়না মিয়া ভুক্তভোগীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাহমিনা জান্নাত সাথি ও নাজমা বেগম হিজড়াদের নারী হিসেবে রূপান্তরের প্রধান কারিগর। আহসান হক ও খাদিজা পারভীন। বিয়ের আসরে তারা কনের ছদ্মবেশী বাবা-মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করেন।

ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ ও অর্থিক ক্ষয়ক্ষতি: সম্প্রতি ছাতকের ফাহিম ও জনৈক প্রবাসী ফারদিন এই ভয়ংকর চক্রের জালে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধুমাত্র একজন প্রবাসীর কাছ থেকেই বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে ১৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক মাসে এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন ধাপে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিবাদ করলে ভুয়া সাংবাদিক ও তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সামাজিক মানহানির ভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তারা শুধু আমার অর্থ নয়, আমার সম্মান এবং বিশ্বাসকেও জবাই করেছে। প্রশাসনের কাছে আমি এই কসাইদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

প্রশাসনের ভূমিকা ও জনরোষ: সিলেটের পাঠানটুলার কুরবানটিলা এলাকায় এই চক্রের অবাধ বিচরণ থাকলেও দীর্ঘকাল তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব নক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে নীরবতা পালন করা হচ্ছে। নিজেকে সাংবাদিক ও উকিল পরিচয় দেওয়া এই প্রতারক চক্রের কারণে প্রবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সচেতন মহলের দাবি: সিলেটের এই ‘কসাই সিন্ডিকেটকে’ অনতিবিলম্বে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান এখন সময়ের দাবি। বিয়ের পবিত্রতাকে কলুষিত করে যারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, সেই ১১ সদস্যের এই চক্রকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করাই এখন জনদাবি। অন্যথায়, রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশের মাটিতে যেমন যুদ্ধ করছেন, দেশের মাটিতেও তারা প্রতারণার শিকারে পরিণত হয়ে নিঃস্ব হতে থাকবেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo