তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: বহুমাত্রিক অপরাধের চক্রব্যূহে অবরুদ্ধ সিলেট মহানগরী এক আমূল প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যানজট, চোরাচালান, ছিনতাই, মাদক, ফুটপাত দখল ও সাইবার অপপ্রচারের মতো জটিল সমস্যায় জর্জরিত এই নগরীতে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে আইনের কঠোর শাসন। আর এই সংস্কার ও অগ্রযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এবং এর দূরদর্শী নেতৃত্ব।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে যখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ও কার্যকারিতা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন এসএমপির কমান্ড গ্রহণ করেন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম। দায়িত্বভার গ্রহণের পর তিনি কেবল দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে পুরো বাহিনীকে পুনর্গঠন করেন। জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও সুধীসমাজের মতামতের ভিত্তিতে তিনি একটি যুগোপযোগী অপরাধ দমন কৌশল প্রণয়ন করেন। তার ঘোষিত অমোঘ নীতি অপরাধীর কোনো আলাদা পরিচয় নেই, তার একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী নগরজুড়ে এক ব্যাপক শুদ্ধি অভিযানের সূচনা করে।
পরিসংখ্যানগত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট মেয়াদের তুলনায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে এসএমপির সামগ্রিক কার্যক্রমে এক অভূতপূর্ব গতিশীলতা এসেছে। এই সময়ে মাদক উদ্ধার সংক্রান্ত মামলা ২৪১টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫৫টিতে উন্নীত হয়েছে এবং জব্দকৃত মাদকের আর্থিক মূল্য প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬১ লাখ টাকা অতিক্রম করেছে। চোরাচালানবিরোধী অভিযানে মামলা ১০৮টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৮টিতে দাঁড়িয়েছে এবং উদ্ধারকৃত অবৈধ পণ্যের মূল্য প্রায় ১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
কেবলমাত্র এপ্রিল মাসের প্রথম পক্ষকালৈ ৮৩৮ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন চিহ্নিত ছিনতাইকারী। জনসচেতনতা ও অপরাধী শনাক্তকরণের সুবিধার্থে প্রতিটি থানায় ছিনতাইকারীদের আলোকচিত্র প্রদর্শনের অভিনব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এছাড়াও, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে পরিচালিত বিশেষ ৩২ ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযানে ১৬১ জন মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে ২৬ রাউন্ড কার্তুজসহ দুজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের বহুমুখী অপরাধ মোকাবিলায় এসএমপি সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে পুনর্গঠিত সাইবার টিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার, ছদ্মবেশী ভুয়া আইডি ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন যে, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় বাধা সৃষ্টি করা পুলিশের অভিপ্রায় নয়; বরং সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩-এর আলোকে ডিজিটাল জালিয়াতি ও কুৎসা রটনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণই এর মূল লক্ষ্য। তিনি মন্তব্য করেন, গঠনমূলক সাংবাদিকতা সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু ভুয়া আইডির অপব্যবহারের কারণে যেন প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
অনতিবিলম্বে নগরীর দীর্ঘস্থায়ী যানজট নিরসনে জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে এযাবৎ ৬,২৭২টি অবৈধ যান জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১,৫Nz২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ১,৬১৩টি সিএনজি অটোরিকশা অন্তর্ভুক্ত। আইন অমান্যকারী যানবাহন আটকের সংখ্যা ১০,৯০৩টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৩,৯০১টিতে উন্নীত হয়েছে এবং আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। ফলশ্রুতিতে নগরীর যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।
স্মার্ট পুলিশিংয়ের অংশ হিসেবে প্রবর্তিত ‘জিনিয়া’ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনটি এখন নগরবাসীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩০ সহস্রাধিক নাগরিক এই অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন, যার মাধ্যমে ২৭৫টি জরুরি কল রিসিভ এবং ৪৫টি জটিল অপরাধের সফল নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখার সুবর্ণ সুযোগ থাকায় অপরাধ দমনে সর্বসাধারণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও, দক্ষিণ সুরমায় কমিশনারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে ৪২২টি চোরাই ও আইএমইআই পরিবর্তিত মোবাইল ফোন উদ্ধারসহ সামগ্রিক মোবাইল উদ্ধারের সংখ্যা ২৪৮টি থেকে ৯২৬টিতে উন্নীত হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া ও দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রেও এসেছে অভূতপূর্ব গতি। ওয়ারেন্ট তামিলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩,২৭৫টিতে পৌঁছেছে এবং সাজা ওয়ারেন্ট কার্যকর হয়েছে ৩৮৫টি। ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১১২ থেকে ৩১৪-এ উন্নীত হওয়ায় রাজপথে অপরাধের মাত্রা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে, যার সুপ্রভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সামাজিক অপরাধের গ্রাফ নিম্নমুখী হয়েছে।
সর্বশেষ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ড্রোন প্রযুক্তি, নিশ্ছিদ্র গোয়েন্দা নজরদারি এবং ‘জিনিয়া’ অ্যাপের ত্রিমাত্রিক সমন্বয়ে সিলেটে ‘জিরো ইনসিডেন্ট’ বা সম্পূর্ণ সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এই আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জনমুখী রূপান্তর দেশের অন্যান্য মহানগর পুলিশের জন্য একটি অনুকরণীয় ও কালজয়ী মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
Leave a Reply