তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে সড়ক সংস্কারের নামে সরকারি কোষাগারের ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এক ‘মহাহরি লুট’ ও কারিগরি অদূরদর্শিতার নির্লজ্জ চিত্র ফুটে উঠেছে। কাজ শেষ হতে না হতেই নবনির্মিত সড়ক ধসে পার্শ্ববর্তী বাসিয়া নদীতে বিলীন হতে চলায় জনমনে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশলীর সীমাহীন গাফলতি, অপরিকল্পিত নকশা এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কার্যত জলে গেছে।
সংস্কারের প্রলেপ মুছতেই কঙ্কালসার দশা: পৌরশহরের নোয়াগাঁও থেকে ৩ নং অলংকারী ইউনিয়নের টেংরা রত বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন চলাচলের অনুপযোগী ছিল। মাত্র ছয় মাস পূর্বে সড়কটিকে সংস্কারের আওতায় এনে কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, উদ্বোধনের রেশ কাটতে না কাটতেই সড়কের বিশাল অংশ এবং নবনির্মিত কালভার্ট ধসে পড়ে।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, বাসিয়া নদীর পাড় ঘেঁষে কোনো প্রকার মজবুত রিটেইনিং ওয়াল বা টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই দায়সারাভাবে পিচ ঢালাই করা হয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিন ও নদীর তীরের বালু মিশ্রিত সামগ্রী ব্যবহারের ফলে পিচ সরে গিয়ে মাটি ধসে পড়ছে সরাসরি নদীর বুকে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি কোনো উন্নয়ন নয়, বরং নদীগর্ভে সরকারি টাকা বিসর্জনের এক পরিকল্পিত নীল নকশা।
সংসদ সদস্যের তর্কালাপ ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়: সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী লুনা উপজেলা প্রকৌশলী ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে রাস্তাটি পরিদর্শন করতে গেলে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কের বেহাল দশা ও দুর্নীতির সচিত্র অভিযোগ তুলে ধরলে সংসদ সদস্য তাদের আশ্বস্ত করার পরিবর্তে উল্টো বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনার একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে নেটদুনিয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।
পরবর্তীতে ওই সড়কেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। জনরোষের তীব্রতা অনুধাবন করে সংসদ সদস্য পুনরায় কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে পাঠান এবং গত ২৯শে এপ্রিল উপজেলা প্রকৌশলীকে সড়কের পাশে সুরক্ষা ব্লক নির্মাণের নির্দেশ দেন। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, “ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর তালি দেওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কি জনগণের করের টাকার অপচয় ও জীবনের ঝুঁকি রোধ করা সম্ভব?”
অনিয়মের খতিয়ান ও জনরোষ: উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৫ বছর একই কর্মস্থলে অবস্থান করে দুর্নীতির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দকৃত প্রায় দুইশত কোটি টাকার কাজ নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ দানা বেঁধেছে। আটটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় চলমান এসব কাজেও একই ধরনের নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
বিক্ষুব্ধ জনতার দাবি, যথাযথ ভূতাত্ত্বিক জরিপ ছাড়াই কেন এই স্পর্শকাতর স্থানে রাস্তার কাজ করা হলো, তার জবাবদিহি করতে হবে। প্রকৌশলীর মনগড়া নকশা আর তদারকির অভাবে উন্নয়নের সুফল ভোগ করার আগেই রাস্তাটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অবিলম্বে এই কর্মকর্তার অপসারণ ও প্রকল্পের উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত চান স্থানীয় বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ।
কর্তৃপক্ষের সাফাই ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত: দুর্নীতির অভিযোগ ও কারিগরি ত্রুটি প্রসঙ্গে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন খান গণমাধ্যম জানান, এটি মূলত ‘টেকনিক্যাল’ বা কারিগরি জটিলতা। তিনি বলেন, “এলজিআরডির কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ হয়েছে। আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চেষ্টা করছি।”
তবে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তীরের নাজুক ভৌগোলিক গঠন বিবেচনা না করে এবং কোনো প্রকার শক্তিশালী গার্ডওয়াল বা সিসি ব্লক ছাড়াই পিচ ঢালাই করা ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। প্রকৌশলবিদ্যার প্রাথমিক সূত্রাবলী উপেক্ষা করার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে এবং ২ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকার সরকারি বরাদ্দ এখন আক্ষরিক অর্থেই নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
উন্নয়ন যখন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে এবং জবাবদিহিতার অভাব প্রকট হয়, বিশ্বনাথের এই সড়কটি তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপই কেবল বাসিয়া তীরের এই জনপদের দুর্ভোগ লাঘব করতে পারে এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
Leave a Reply