সিলেট ব্যুরো: সিলেট মহানগর বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘বিকাশ’-এর সিলেট বিভাগীয় ডিস্ট্রিবিউটর নাসিম হোসাইনের ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি)। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পরিকল্পিত ছিনতাইয়ের পেছনে নাসিম হোসাইনের নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মীদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগসাজশ থাকতে পারে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নাটকীয় ছিনতাই: শুক্রবার (৮ মে) সকালে এই ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, নাসিম হোসাইন তার কর্মীদের মাধ্যমে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টের কাছে বিতরণের জন্য মোট ৮১ লাখ ৮২ হাজার টাকা পাঠান। সকাল পৌনে ১১টার দিকে টাকা বহনকারী প্রাইভেট কারটি মোগলাবাজার থানার পারাইরচক লালমাটিয়া এলাকায় পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেলে আসা তিন আরোহী গাড়িটিকে থামার সংকেত দেয়। চালক গাড়ির গতি কমালে দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একজনকে মারধর করে এবং গাড়িতে থাকা পাঁচটি ব্যাগের মধ্য থেকে ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে দ্রুত চম্পট দেয়।
অভিযানে পুলিশের সাফল্য: ঘটনার পর পরই অভিযানে নামে সিলেট মহানগর পুলিশের একাধিক টিম। শনিবার বিকেলে এসএমপির মিডিয়া সেল জানায়, বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বিকাশের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীরাও রয়েছেন: বিকাশের কর্মকর্তা: শাহেদ আহমদ (৪২) – সুপারভাইজার; আদনান (৩৮), আবু তাহের (২৬) ও রূপায়ন বিশ্বাস (৪০) – ডিএসও (ডিস্ট্রিবিউশন সেলস অফিসার)।
নিরাপত্তা স্কর্ট সদস্য: রোমান আহমদ (৪৪), সালমান আহমদ (২৮), গোলাম শহীদ (২৯) ও জুনায়েদ (২২)।
অন্যান্য: কামাল হোসেন (৩৫)।
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’: প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, এই ছিনতাই কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘ইনসাইডার জব’ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
তদন্তে উঠে আসা কয়েকটি সন্দেহজনক বিষয় হলো- গাড়ির গতি কমানো: জনশূন্য এলাকায় অপরিচিত মোটরসাইকেলের সংকেত পেয়েও চালক কেন গাড়ি থামালেন বা গতি কমিয়ে সুযোগ করে দিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিরাপত্তার অভাব: নিয়ম অনুযায়ী বড় অঙ্কের টাকা পরিবহনের সময় স্কর্ট সদস্যদের গাড়ির সাথেই থাকার কথা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে রোমান, সালমান, গোলাম শহীদ ও জুনায়েদ ঘটনার সময় মূল গাড়ির সঙ্গে ছিলেন না।
কর্মকর্তাদের ভূমিকা: শাহেদ, আদনান ও রূপায়ন বিশ্বাসের গতিবিধি এবং তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে পুলিশ নিবিড় অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
“প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, ডাকাতদের সাথে অভ্যন্তরীণ কর্মীদের একটি আঁতাত ছিল। আমরা এই চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছি।” — মিডিয়া সেল, সিলেট মহানগর পুলিশ।
নাসিম হোসাইনের প্রতিক্রিয়া: নিজের কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, “এখনও পর্যন্ত বিকাশ কর্মীদের বাইরে অন্য কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে যারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত, তারা আমার কর্মী হলেও ছাড় পাওয়ার যোগ্য নয়।” তিনি অবিলম্বে লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধার এবং এই চক্রের পেছনে থাকা প্রভাবশালী কাউকেও যদি পাওয়া যায়, তবে তাদেরও আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃতদের মোগলাবাজার থানায় নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। লুণ্ঠিত অবশিষ্ট টাকা উদ্ধার এবং মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে নগরজুড়ে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
Leave a Reply