বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাটে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষকে বৈধতা দিতে গড়ে উঠেছে এক বেপরোয়া সিন্ডিকেট। অবৈধ পশুর গায়ে বৈধতার স্ট্যাম্প মারতে চলছে অভিনব জালিয়াতি অবৈধ ‘পীরের বাজার’ থেকে গরু কেনাবেচা করে রশিদ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘মাতুরতল বাজার হাটের’। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলমান এই চোরাচালান ও জালিয়াতির মহোৎসবে খোদ গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধার ভাগ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বঙ্গবীর সড়কে সরেজমিন অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। রাস্তা দিয়ে যাওয়া গরু বোঝাই একাধিক পিকআপ ও মিনি ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি করলে দেখা যায়, প্রতিটি গাড়ির চালকের কাছে থাকা রশিদের উপরের অংশে লেখা ‘মাতুরতল বাজার হাট, গোয়াইনঘাট, সিলেট’। কিন্তু সাংবাদিকদের জেরার মুখে চালকরা অকপটে স্বীকার করেন, তারা গরুগুলো মূলত ‘পীরের বাজার’ থেকে ট্রাকে বোঝাই করেছেন। পীরের বাজারের কোন বৈধতা না থাকলেও সেখান থেকে গরু এনে মাতুরতল হাটের রশিদ ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে চালকরা অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তবে তারা জানান, ‘হেলাল ভাই’ নামের এক ব্যক্তি তাদের হাতে এই রশিদগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন।
এক চালকের ভাষ্যমতে, ওইদিন সকাল থেকেই অন্তত ২০ থেকে ৩০টি গরুর গাড়ি পীরের বাজার থেকে একই কায়দায় মাতুরতল বাজারের ভুয়া রশিদ নিয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে রওয়ানা হয়েছে।
রাস্তার গতিপথ এবং রশিদে উল্লিখিত বাজারের অবস্থানের মধ্যে বিস্তর অসঙ্গতি থাকায় সন্দেহ ঘনীভূত হয়। সাংবাদিকরা গরু বোঝাই গাড়ি থামিয়ে জানতে চান, “স্লিপ তো মাতুরতল বাজারের, কিন্তু আপনারা তো আসছেন বঙ্গবীর পয়েন্টের দিক থেকে। মাতুরতল বাজার তো কলেজের ওই পাশে, তাহলে আপনারা এই রাস্তায় কেন?” এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পেরে গাড়িতে যাত্রীবেশে থাকা চোরাকারবারিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে তারা সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণে বাধা প্রদান করে এবং বিরক্তি প্রকাশ করে রশিদে থাকা বাজার কর্তৃপক্ষের নম্বরে ফোন করে বিষয়টি যাচাই করে নিতে বলে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুই হাটের রশিদের এই জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে চার সদস্যের এক প্রভাবশালী চক্র। এই চার কুতুব হলেন, হেলাল উদ্দিন, ফরিদুল, সেবুল এবং ইমাম। মূলত এই চারজনই সুকৌশলে অবৈধ পীরের বাজার থেকে কেনা ভারতীয় চোরাই গরুর গায়ে মাতুরতল বাজারের রশিদ সেঁটে দিয়ে সেগুলোকে বৈধতা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে ভারতীয় চোরাই গরু পাচার করছেন সমগ্র দেশে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত চার কুতুব সহ গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে কেউই কল রিসিভ না করায় বক্তব্য সংগ্রহ করা যায় নি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই চক্রের এমন বেপরোয়া দৌরাত্ম্যের পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের নির্লজ্জ নীরবতা। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের অভিযোগ, এই অবৈধ চোরাচালান ও জালিয়াতি নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে বড় অঙ্কের ভাগ যাচ্ছে গোয়াইনঘাটের ইউএনও রতন কুমার অধিকারীর পকেটে। প্রশাসনের যোগসাজশেই এমন প্রকাশ্যে জালিয়াতি চলছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এক হাটের গরু অন্য হাটের রশিদে পরিবহনের এই জালিয়াতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই চার চোরাকারবারির সাথে আরও কোনো প্রভাবশালী চক্র জড়িত আছে কি না এবং এর মাধ্যমে সরকারের ঠিক কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply