ফাঁড়ি ফাঁকা, হোটেলই অঘোষিত কার্যালয়! | তদন্ত রিপোর্ট

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ পূর্বাহ্ন

ফাঁড়ি ফাঁকা, হোটেলই অঘোষিত কার্যালয়!

ফাঁড়ি ফাঁকা, হোটেলই অঘোষিত কার্যালয়!

Manual1 Ad Code

নিজস্ব সংবাদদাতা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানের সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গ করে সিলেটে এক মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সোবহানীঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শিপলু চৌধুরী। মাদক কারবারি, চোরাকারবারি এবং কুখ্যাত অপরাধী চক্রের সাথে তার প্রকাশ্য ও নিবিড় সখ্যতা এখন স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের প্রধান আলোচ্য বিষয়। রাষ্ট্রপ্রদত্ত পবিত্র পোশাক ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সোবহানীঘাট এলাকাকে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

Manual2 Ad Code

ফাঁড়ি ছেড়ে ‘হোটেল কার্যালয়ে’ গোপন বৈঠক: অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোবহানীঘাট ফাঁড়িতে এসআই শিপলু চৌধুরীকে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় মেলা ভার। ফাঁড়ি থেকে মাত্র এক মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত ‘আল-করিম হোটেল’ নামক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে তিনি নিজের অঘোষিত প্রধান কার্যালয় ও ‘সেফ হাউস’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে চোরাকারবারি ও অপরাধ জগতের কুশীলবদের সাথে তার রহস্যজনক গোপন বৈঠক চলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই অসাধু ও অনৈতিক সমঝোতার সুযোগেই সোবহানীঘাট-কালিঘাট সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত অবাধে প্রবেশ করছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ মালামাল।

Manual5 Ad Code

নাকের ডগায় ‘হানিট্র্যাপ’ ও রহস্যজনক নীরবতা: শিপলু চৌধুরীর চরম পেশাগত অযোগ্যতা ও অপরাধমূলক উদাসীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ফাঁড়ির একদম সন্নিকটে, যতরপুর এলাকায় গড়ে ওঠা ‘হানিট্র্যাপ’ বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের একটি সুসংগঠিত আস্তানা ঘিরে। নিরীহ সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে জিম্মি করা এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো জঘন্য অপরাধ সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চললেও এসআই শিপলু রহস্যজনকভাবে নির্বিকার ছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেখানে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে এই চক্রটিকে হাতেনাতে আটক করে। এই ঘটনার পর জনমনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—নাকের ডগায় ঘটা এমন পৈশাচিক অপরাধের বিষয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে শিপলু চৌধুরী কি আসলেই অজ্ঞ ছিলেন, নাকি মাসোহারা ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সচেতনভাবেই চক্ষু বুজে ছিলেন?

Manual2 Ad Code

‘উর্দিহীন’ পুলিশিং: চেইন অব কমান্ডের চরম লঙ্ঘন: এসআই শিপলুর নিয়মহীন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে খোদ পুলিশ বিভাগেই চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, সোবহানীঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জ হওয়া সত্ত্বেও কোনো আভিযানিক কার্যক্রমে তিনি অফিশিয়াল ইউনিফর্ম পরিধান করেন না। একাধিক ভিডিও ফুটেজে তাকে সাধারণ পোশাকে (সিভিল ড্রেস) অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে। এমনকি আল-করিম হোটেলে অপরাধীদের সাথে অপরাধমূলক শলাপরামর্শের সময়ও তিনি সিভিল পোশাকে অবস্থান করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: যেখানে স্বয়ং এসএমপি কমিশনার নিয়মিত সরকারি পোশাক পরিধান করে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখছেন, সেখানে একজন সাব-ইন্সপেক্টর কীভাবে দিনরাত পুলিশের পোশাক ছাড়া চলাফেরা করেন এবং অভিযানে যান? এটি চেইন অব কমান্ডের সুস্পষ্ট ও ধৃষ্টতাপূর্ণ লঙ্ঘন।

Manual5 Ad Code

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সহিংস ভূমিকা ও ভোলবদল: বিগত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে এসআই শিপলুর ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কিত ও সহিংস। তৎকালীন সময়ে তিনি দক্ষিণ সুরমা থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ৪ আগস্ট হুমায়ুন চত্বর ও কদমতলী এলাকায় ছাত্র-জনতার যৌক্তিক আন্দোলনের ওপর নির্বিচারে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলিবর্ষণের নারকীয় ঘটনায় তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। সেই বর্বরোচিত হামলায় দুই শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ গুরুতর আহত হন এবং তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর এই চতুর কর্মকর্তা খোলস বদলে ফেলেন। নিজেকে নগরীর তালতলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে মিথ্যা দাবি করলেও, প্রকৃত অনুসন্ধানে জানা যায় তার আদি বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তারুল ইউনিয়নের দলগ্রামে। তার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পত্নী জয়া সেনগুপ্তের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দলীয় প্রভাব খাটিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।

চোরাচালান জব্দের নাটকে অপরাধীকে পলায়নের সুযোগ: সম্প্রতি নাইওরপুলে অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা ৭০ বস্তা ভারতীয় জিরার চালান জব্দ করার ঘটনাটি এসআই শিপলুর অপরাধের খাতায় নতুন এক রহস্যের জন্ম দিয়েছে। জিরার অবৈধ মালিক দাবিদার আব্দুস সাত্তার খান মিন্টু নামক এক ব্যক্তি ভুয়া নিলামের কাগজ নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও, পুলিশের সম্মুখভাগ দিয়েই তিনি নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যান।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসআই শিপলু নিজেই মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন যে, নিলামের কাগজের সাথে জব্দকৃত মালের ওজনে ও বস্তার সংখ্যায় বিশাল গরমিল রয়েছে। অর্থাৎ, এটি যে চোরাচালানের পণ্য—তা নিশ্চিত হয়েই তিনি মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর ও রহস্যজনকভাবে, মূল অপরাধী ও তদবিরবাজ মিন্টুকে হাতের নাগালে পেয়েও তাকে আটক না করে, অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনি দায় সেরেছেন তিনি। অপরাধীকে সামনে পেয়েও কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হলো না, তা নিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনের ভেতরেই তীব্র তোলপাড় ও কানাঘুষা চলছে।

জনমনে চরম অসন্তোষ: রাত ১টার পর সোবহানীঘাট ফাঁড়ি সংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের অবাধ বিচরণ এবং এসআই শিপলুর রহস্যময় নীরবতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাব বোধ হচ্ছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে তিনি অপরাধীদের সাথে এমন গভীর ও অনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখেন এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের প্রভাবশালী আমলনামা নিয়েও বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যান, তা নিয়ে জনমনে শত কোটি টাকার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

সচেতন সমাজ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই ‘উর্দিহীন’ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন? নাকি এসআই শিপলুর অদৃশ্য ‘আলাদিনের চেরাগ’ ও অবৈধ অর্থের দাপট সব অকাট্য অভিযোগকেই অন্ধকারের অতলে আড়াল করে দেবে? (চলবে…)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo

Follow for More!

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code
error: Content is protected !!