নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশে পূর্বতন ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসরদের দাপট ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া থামেনি। অভিযোগ উঠেছে, রেঞ্জ ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও রহস্যময় বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী মত দমনে সক্রিয় থাকা বিতর্কিত কর্মকর্তারা পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদে আসীন হচ্ছেন। এতে বঞ্চিত ও নিগৃহীত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহের দাবি অনুযায়ী, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করা যেসকল ওসিদের ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর প্রত্যাহার করা হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকেই এক বিশাল অংশকে পুনরায় রিকুইজিশন দিয়ে ময়মনসিংহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন করা হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতনকারী এই কর্মকর্তাদের পুনরায় কোন অলৌকিক ক্ষমতায় বা কী বিশেষ বিবেচনায় জননিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে?
দাপ্তরিক নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার নির্দেশনায় জেলা পুলিশ সুপারগণ এই বিতর্কিত আদেশগুলো জারি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র বদলি দেখিয়ে একই জেলার এক থানা থেকে অন্য থানায় সরিয়ে দিয়ে ‘দৃশ্যমান পরিবর্তন’ হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের জয়জয়কার:
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানায় মোঃ আব্দুল মজিদকে ওসি হিসেবে পদায়নের ঘটনায় চরম নাটকীয়তা লক্ষ্য করা গেছে। পদায়নের মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের মুখে তার বদলি আদেশ বাতিল করে জেলা পুলিশে সংযুক্ত করা হয়। স্থানীয় বিএনপি ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মজিদ বিগত শাসনামলে মুক্তাগাছা ও নান্দাইল থানায় কর্মরত থাকাকালীন বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ভালুকা মডেল থানায় সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ হুমায়ুন কবীরকে ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে, সেখানে সরাসরি দলীয় ক্যাডারভিত্তিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা কর্মকর্তারা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পাচ্ছেন?
ডিআইজি’র ‘বগুড়া গ্রুপ’ ও অদৃশ্য সমঝোতা:
পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া নিজেকে রক্ষার ঢাল হিসেবে পুলিশের কথিত ‘বগুড়া গ্রুপ’-এর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক প্রভাবশালী বিশেষ সহকারীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি বিএনপিপন্থী বা পেশাদার কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব ‘গুপ্ত’ বলয় তৈরি করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এই পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
কর্মকর্তাদের ওপর গণবদলির খড়গ:
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্প্রতি কোনো যুক্তিসঙ্গত প্রশাসনিক কারণ ছাড়াই জামালপুর জেলার বাসিন্দা এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জে কর্মরত অন্তত ৩০-৩৫ জন পুলিশ সদস্যকে গণহারে বদলি করা হয়েছে। এই ‘অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য’ ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপের ফলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং পেশাদার কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। জামালপুর জেলা ছাত্রদল নেতা সেলিম শাহরিয়ার বলেন, “এটি পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তাদের টার্গেট করে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস।”
বঞ্চিতদের আর্তনাদ ও তদন্তের দাবি:
বহু বছর ধরে বঞ্চিত থাকা সৎ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, “আমরা বিগত স্বৈরাচারী আমলে নির্যাতিত হয়েছি, আর বর্তমান আমলেও কৌশলী বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।” এদিকে, বিতর্কিত পদায়নের বিষয়ে ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি কিংবা কোনো বার্তার উত্তর দেননি।
অভিযোগের বাদী আজিজুল ইসলাম জানান, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি উচ্চপর্যায়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন এবং ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে ওসি পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বৈরাচারের দোসরদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ শিরা-উপশিরা থেকে দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
Leave a Reply