নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সাইনবোর্ড আর ভুয়া সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণার এক মহোৎসবের অভিযোগ উঠেছে কাজী মাহমুদুল হাসান মাহমুদ নামক এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নিজেকে ‘চেয়ারম্যান’ ও ‘সম্পাদক’ দাবি করে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়।
ভুয়া পরিচয়ের মায়াজাল:
অনুসন্ধানে জানা যায়, কাজী মাহমুদুল হাসান নিজেকে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তাকারী সংস্থা’র চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র এবং সংস্থার অভ্যন্তরীণ তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে তার এই দাবির কোনো বৈধ ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। মূলত পদ-পদবি ব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করাই ছিল তার প্রধান কৌশল। শুধু মানবাধিকার নয়, নিজেকে তিনি ‘আজকের গোয়েন্দা সংবাদ’ নামক একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দাবি করেন। অথচ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই পত্রিকার তালিকার কোথাও তার নাম নেই। অর্থাৎ, সাংবাদিকতার এই পরিচয়টিও ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া ও স্বঘোষিত।
প্রতারণার অভিনব কৌশল:
কাজী মাহমুদুল হাসানের প্রতারণার শিকার মূলত গ্রামের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গ্রামের মানুষদের মানবাধিকার সংস্থার ‘সদস্য’ হওয়ার প্রস্তাব দিতেন। সদস্য হলে আইনি সুরক্ষা এবং সামাজিক প্রভাব পাওয়া যাবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করতেন।
এছাড়া স্থানীয়ভাবে কোনো বিবাদ বা ব্যক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ‘সালিশী ফি’ বা ‘আইনি সহায়তা’র নামে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সমস্যা সমাধানের কথা বলে টাকা নিলেও বাস্তবে তিনি কেবল নিজের পকেট ভারী করেছেন।
ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি:
“তিনি নিজেকে বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। আমরা ভেবেছিলাম মানবাধিকারের লোক মানেই অনেক ক্ষমতা। কিন্তু কার্ড দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়ার পর তিনি আর আমাদের ফোন ধরেন না।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী।
ভয়ে নিশ্চুপ ভুক্তভোগী ও পুরস্কার ঘোষণা:
প্রতারণার এই বিশাল নেটওয়ার্ক স্থানীয়ভাবে বেশ শক্তিশালী হওয়ায় অনেক ভুক্তভোগীই মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব খাটিয়ে মাহমুদুল হাসান অনেককেই নিশ্চুপ থাকতে বাধ্য করেছেন। তবে সম্প্রতি তার এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই প্রতারককে ধরিয়ে দিতে নগদ পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।
প্রশ্নবিদ্ধ ন্যায়বিচার:
একটি ভুয়া এনজিও এবং অবৈধ পত্রিকার আড়ালে এমন সুপরিকল্পিত প্রতারণা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে চোখের সামনে চলতে পারল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতারণার শিকার মানুষগুলোর এখন একটাই দাবি—এই প্রতারক চক্রের হোতাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা এবং লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করা। কবে নাগাদ ধরা পড়বে এই তথাকথিত মানবাধিকার চেয়ারম্যান? আর কবেই বা মুক্তি পাবে তার প্রতারণার জালে আটকে থাকা মানুষগুলো? এর উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষায়।
Leave a Reply