মোঃ রায়হান হোসেন: অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ও নদীখেকোদের সাথে খোদ প্রশাসনের অসাধু যোগসাজশের এক নগ্ন চিত্র আবারও উন্মোচিত হলো। রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন লালপুর নৌ-ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) সজল কানু। অবৈধ ড্রেজার ও নৌকা আটকের পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে উল্টো তা ছেড়ে দিয়ে অপরাধীদের সসম্মানে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গত ২৮ জুলাই সংঘটিত এই ঘটনার একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে, যা নৌ-পুলিশের এই কর্মকর্তার চরম ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও বালুদস্যুদের সাথে তার গোপন আঁতাতের অকাট্য প্রমাণ।
ফাঁস হওয়া ওই কল রেকর্ডে স্পষ্ট শোনা যায়, কর্তব্যেরত এক পুলিশ সদস্য সাহসিকতার সাথে অবৈধ ড্রেজার ও নৌকা আটক করে ট্রলারে অবস্থান করছিলেন। ঠিক সে সময়ই আইসি সজল কানু তাকে ফোন করেন। ট্রলারের ইঞ্জিনের তীব্র শব্দের কারণে শুরুতে ওই সদস্য ফোন ধরতে ব্যর্থ হলে পরে তিনি কল ব্যাক করেন। এরপরই আইসি সজল কানু চরম ক্ষিপ্ত হয়ে তার অধস্তন কর্মীকে ড্রেজার ছেড়ে দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন।
কথোপকথনে সজল কানুকে রীতিমতো ধমকের সুরে বলতে শোনা যায়, “ওই এরশাদ যেটা বলতেছে সেটা আপনি শুনবেন তো। কী বলতেছে কী না… ভাইয়া এরশাদ যেটা বলতেছে ওইখান থেকে আপনি চলে আসেন। কথা শুনবেন তো রে ভাই। ঝামেলা করেন কেন এগুলো?” জবাবে অসহায় ওই পুলিশ সদস্যকে বারবার ‘স্যার’ সম্বোধন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এই অন্যায্য ও বেআইনি নির্দেশ পালনে বাধ্য হতে শোনা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কথোপকথন অত্যন্ত ভয়ংকর ইঙ্গিত বহন করে। ফোনালাপ থেকে এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, ‘ এরশাদ নামক কোনো প্রভাবশালী বা মধ্যস্বত্বভোগীর সাথে আইসি সজল কানুর সরাসরি আর্থিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন রয়েছে। রাষ্ট্রের একজন পাহারাদার হয়েও তিনি অবৈধ ড্রেজার আটকের মতো একটি যৌক্তিক আইনি পদক্ষেপকে ‘ঝামেলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অপরাধীদের দমন করার বদলে তিনি নিজেরই অধীনস্থ কর্মীর কর্তব্যে বাধা দিয়েছেন।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পরিবেশ ধ্বংসকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে ছায়া দিয়ে আসছে নৌ-পুলিশের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা। আইসি সজল কানুর এই ফাঁস হওয়া ফোনালাপ সাধারণ মানুষের সেই অভিযোগকেই আজ শতভাগ সত্য প্রমাণ করেছে।
সচেতন মহলের দাবি, আইনের পোশাক গায়ে জড়িয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তার এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ড পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অবিলম্বে এই কল রেকর্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইসি সজল কানু এবং এর নেপথ্যে থাকা বালুদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা, আইনের রক্ষকদের এমন প্রকাশ্য প্রশ্রয়ে নদী ও পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হবে না।
ধারাবাহিক সংবাদ নং- ১১