মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেটের পর্যটন সমৃদ্ধ সীমান্ত জনপদ জাফলংয়ের আকাশে ১৬ বছরের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটলেও, জনমনে বিভীষিকার মেঘ এখনো অপসৃত হয়নি। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের পর রাঘববোয়ালরা আত্মগোপনে গেলেও ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে ভিন্ন চিত্র। সেখানে প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বীরদর্পে বিচরণ করছেন হত্যা ও গুমের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য চেয়ারম্যান মামুন পারভেজ। কেবল প্রকাশ্যে মহড়াই নয়, সর্বশেষ গত ২৯শে এপ্রিল ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের অভ্যন্তরেই সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ৫৫ লক্ষ টাকা ছিনতাইয়ের মাধ্যমে তিনি তার ‘ত্রাসের রাজত্ব’ পুনরায় কায়েম করেছেন।
পরিষদ যখন টর্চার সেল ও ছিনতাইয়ের আখড়া:
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত মামুন পারভেজ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনকে একাধারে ব্যক্তিগত টর্চার সেল, মাদক কারবারের সদর দপ্তর এবং সিন্ডিকেটের আস্তানায় রূপান্তর করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯শে এপ্রিল বুধবার বিকেলে ইউনিয়ন উন্নয়ন কর আদায়ের ইজারা প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে চেয়ারম্যানের কক্ষেই এক নারকীয় তান্ডব চালান মামুন ও তার সশস্ত্র অনুসারীরা। ৬১ লক্ষ টাকার সর্বোচ্চ দরদাতা শাহরিয়ার তামিম উজ্জ্বলকে ইজারাদার ঘোষণা করার পরপরই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মামুন পারভেজ। তার নির্দেশে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রমজান আলী, কবির আহমদ, ফারুক আহমদসহ একদল দুষ্কৃতকারী কক্ষের দরজা অবরুদ্ধ করে হকিস্টিক ও লোহার পাইপ দিয়ে ইজারাদার ও তার সঙ্গীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। এসময় তারা ব্যাগে থাকা নগদ ৫৫ লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নেয়।
রক্তাক্ত জুলাইয়ের নায়ক ও ফেরারি’র দাপট:
পুলিশি নথি ও মামলার বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে যখন সিলেটের রাজপথ ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন কোতোয়ালি ও শাহপরাণ এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই মামুন পারভেজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ততা ও ছাত্র হত্যার দায়ে তার বিরুদ্ধে সিলেট কোতোয়ালি থানায় (মামলা নং: ৫০/৫৮৭) এবং গোয়াইনঘাট থানায় (জিআর ১৯১/২৪) পৃথক দুটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা রয়েছে। আইনত তিনি ‘ফেরারি’ হলেও স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিচরণ জনমনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অবৈধ সম্পদ ও চোরাচালান সিন্ডিকেট:
মৃত মইনুল হোসেনের পুত্র মামুন পারভেজ দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জাফলং সীমান্তের পাথর ও বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং সীমান্তে চোরাচালান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি শিথিল হওয়ার সুযোগে তিনি পুনরায় এলাকায় ফিরে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠেছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য ও জনরোষ:
চেয়ারম্যান কার্যালয়ে ছিনতাই ও হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে কামাল উদ্দিন নামক এক ব্যক্তি গোয়াইনঘাট থানায় ৭ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১২ জনকে আসামি করে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সিলেটের পুলিশ সুপারের (এসপি) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে গণমাধ্যমে বলেন- “অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা হবে।” গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানও গণমাধ্যমে বলেন- আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছেন।
সরকার পরিবর্তনের পরও মামুনের এই ‘বুলডোজার শাসন’ ও প্রকাশ্যে লুণ্ঠনের ঘটনায় জাফলংয়ের সাধারণ ব্যবসায়ীরা জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কায়। সীমান্তের চোরাচালান রোধ ও এলাকায় শান্তি পুনরুদ্ধারের স্বার্থে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply