উপর মহল ম্যানেজ করে চলি: ওসি কানাইঘাট | তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

উপর মহল ম্যানেজ করে চলি: ওসি কানাইঘাট

উপর মহল ম্যানেজ করে চলি: ওসি কানাইঘাট

Manual5 Ad Code

তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: চোরাচালান বাণিজ্য বন্ধ করতে জেলা ও বিভাগীয় আইনশৃংখলা প্রতিটি মিটিংয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও কোন ভাবে এসব চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা স্থানীয় প্রশাসন গুলো। এদিকে প্রতি সপ্তাহে কোটি-কোটি টাকার ভারতীয় চোরাইপণ্য বিজিবির হাতে আটক হচ্ছে। তবু কোন ভাবে থামিয়ে রাখা যাচ্ছেনা চোরাকাবারিদের। এসব অভিযানে চোরাই পণ্য জব্দ হলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে মুল হোতারা। যারা ধরা পড়ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, তারা এসবের বাহক মাত্র। বিজিবির লোক দেখানো অভিযান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকেরা।

Manual6 Ad Code

স্থানীয় সাংবাদিকরা মাঝে লেখালেখি করলে কানাইঘাট থানার ওসি বলছেন, এসব লেখায় কিছু হবেনা। আমি উপর মহল ম্যানেজ করে চলি। আমি তাদের খুশি করতে পারলে, তারাই আমাকে যতদিন খুশি রাখবেন। একটি ওসির চেয়ারে আসতে হলে কত টাকা দিয়ে, কিভাবে আসতে হয় সাংবাদিকরাও সেটা জানেন। অপরদিকে চোরাকাবারিদের লেলিয়ে দেওয়া হয় সেই সাংবাদিকের পিছনে প্রথমে ম্যানেজের চেষ্টা পরে ওসির ফিটিং মামলা হুমকিতো আছেই। এরপর ঐ সাংবাদিকের পিছনে ওসি লেলিয়ে দেয় চোরাকাবারিদের অপপ্রচার প্রপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য। এক সময় ঐ সাংবাদিককেই চোরাকারবারি বাণিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাই স্থানীয় মুলধারা সাংবাদিকরা সব দেখেও চুপ করে থাকেন। তবে এখানে ওসিকে মদদ যোগায় কতিপয় কিছু সাংবাদিক, লেবাসদারী কিছু রাজনৈতিককর্মী যারা দিন শেষে ওসির কাছ থেকে অর্থনৈতিক বা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন। কানাইঘাট থানার ওসির হয়ে গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে নন্দিরাই গ্রামের জমির আলীর ছেলে কামাল উদ্দিন। কামাল উদ্দিন একটি হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার তালিকা ভুক্ত আসামী। সূত্রমতে এই কামাল উদ্দিনের বাড়িতেই রয়েছে ভারতীয় চোরাই চিনির একটি গোদাম। ওসি কামালের মতো অনেককে দিয়েই ভারতীয় চোরাচালানের সদরের লাইন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

সূত্রমতে, চোরাচালানের পণ্যের মূল্য হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে ভারতের ব্যবসায়ীদের হাতে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে সীমান্তে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। যদিও পুলিশ ও বিজিবি জানিয়েছে আগের চেয়ে সীমান্তে নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রতিরাতে রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় চোরাইপন্য নিয়ে শহরের দিকে সাই-সাই শব্দে আসছে চোরাইপন্যবাহি গাড়ী তবে তামাবিল রোডের কিছু অংশে মাঝে মাঝে সেনা টহল থাকায় গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর থানার সকল চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে কানাইঘাটের সদর ইউনিয়ন। চোরাকাবারিরা স্বীকার করে বলছেন, জৈন্তাপুর উপজেলার দরবস্ত এলাকার একটি সেনা ক্যাম্প থাকায় তাদের ফাঁকি দিতে চোরাচালানের পণ্য এখন তারা দরবস্তবাজার থেকে চতুল হয়ে কানাইঘাট এবং হরিপুর, ফতেপুর, বাঘের সড়ক দিয়ে আসা গাড়িগুলো হরিপুর-গাছবাড়ি বাইপাস রোড দিয়ে কানাইঘাটের রাজাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জের বাঘা হয়ে সিলেট সহ সারাদেশে পাচার করছেন। তবে তারা নিয়মিত পুলিশ ও জেলা ও উত্তর ডিবি পুলিশের টাকা লাইনম্যানদের হাতে দিয়ে আসছেন। এখন কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকে বখরা দিতে হয় চা পানির জন্য। এদিকে ভারতীয় পাহাড়ি-স্থল সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে আসা ভারতীয় চোরাই চিনি, গরু, মহিষ, কসমেটিক্স, বিড়ি, মোটরবাইক, মাদক, অস্ত্র সহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কানাইঘাট থানার বিভিন্ন রোড দিয়ে সিলেট শহরে অবাধে নিয়ে যাচ্ছেন চোরাকারবারিরা। কানাইঘাট থানা সদরের অদূরেই জকিগঞ্জ উপজেলার শাহবাগ ও সিলেট জকিগঞ্জ সড়ক। এ সড়কের শাহবাগ স্টেশন হয়ে গাড়ি দিয়ে চোরাইপণ্য সরবরাহ করা হয় সিলেট সহ সারাদেশে।

সরেজমিনে রাতে কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ি বোরহান উদ্দিন রোডে দাড়িয়ে দেখা যায় বোরহান উদ্দিন রোড দিয়ে ডজন ডজন ভারতীয় গরু-মহিষসহ চোরাচালানের গাড়ি সিলেটের বাইপাস সড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। টহল পুলিশ লেগুনা বা সিএনজি সাইড করে দাড়িয়ে থাকে, গাড়ি সামনে আসলে একজন কনেষ্টবল গিয়ে ড্রাইভারের হাত থেকে কিছু একটা নিয়ে নিজের গাড়িতে ফিরে আসছেন। এক কথায় চোরাচালানের সব চেয়ে নিরাপদ রোড এখন কানাইঘাট থানার রোডগুলো।

Manual7 Ad Code

এদিকে শাহবাগ থেকে জকিগঞ্জ থানা সদর অনেক দূরবর্তী হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালে অনেকটা বাইরে এলাকাটি। ফলে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে দেশে আসা চোরাইপণ্যের বেশির ভাগ কানাইঘাট সদর ও শাহবাগ স্টেশন দিয়ে নির্বিঘ্নে সারাদশে সরবরাহ হচ্ছে।

অনুসন্ধান ও স্থানীয় তথ্যমতে কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের বড়বন্দ এলাকার হারুন, ফয়ছল, রুবেল, খাজই, নাজরান, আলঙ্গীর, লোকমান, হেলাল, ফয়াজ সহ বেশ কয়েকজন ভারতীয় চা-পাতার সাথে কসমেটিকস ও মাদক সামগ্রী নিয়ে এসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে। দিঘীরপার পূর্ব ইউনিয়নের দীঘিরপার ও আন্দুরমুখ বাজার এলাকা দিয়ে ভারতীয় চিনি ও চা পাতা চোরাচালানের সাথে জড়িত দিঘীরপার গ্রামের বিএনপি নেতা কামাল উদ্দিন, লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের ভাটিবারা পৈত গ্রামের আওয়ামিলীগ নেতা রঞ্জন, দিঘীরপার গ্রামের রুবেল, জাকারিয়া, জয়ফৌদ গ্রামের আব্দুস সালাম, ইউপি সদস্য শাহাব উদ্দিন, আব্দুস শুক্কুর। মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের সোনারখেড় গ্রামের কুটি মিয়ার পুত্র বোরহান উদ্দিন, আতাউর রাহমানের পুত্র বিলাল আহমদ,আব্দুল মন্নানের পুত্র শফিক আহমদ, নারাইনপুর গ্রামের শামীম আহমেদের পুত্র আব্দুল করিম, তাহির আলীর পুত্র সফির আহমদ সরাসরি জড়িত।

কানাইঘাটের পূর্ব সীমান্ত এলাকা কারাবাল্লা, ডোনা-মূলাগুল, লক্ষীপ্রসাদ, হয়ে আসা ভারতীয় পণ্য নদীপথে কানাইঘাট খেওয়াঘাট দিয়ে সড়কে উঠানো হয়ে থাকে। সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বাজার এলাকার আশেপাশে বেশ কয়েটি রোড দিয়ে রাত হলে অবাধে নামানো হচ্ছে ভারতীয় গরু মহিষ। এলাকার লোকজন ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেনা, কারন চোরাকারবারিদের সাথে সরাসরি থানার লোকজন জড়িত রয়েছে। জৈন্তাপুর এলাকার একাধিক চোরাকারবারি জানান, সম্প্রতিকালে সিলেট-তামাবিল সড়কের হরিপুর বাজারস্থ চোরাচালান কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর অভিযান জোরদার হওয়ায় সীমান্তের এই তিন থানার সকল পণ্যই দরবস্ত কানাইঘাট হয়েই পাচার হচ্ছে, যার ফলে খরচটা বেড়ে গেছে, পুলিশও গাড়ি প্রতি রেইট বাড়িয়ে দিয়েছে এখন।

কানাইঘাট থানা সদর কেন্দ্রিক একটি চোরাচালানী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চোরাই পণ্যের সমাহার পাচার হচ্ছে। আর এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে কানাইঘাটের বায়মপুরের কুখ্যাত বুঙ্গাড়ী শিব্বির, থানার রামপুরের বুঙ্গাড়ী ছালেহ আহমদ ও পার্শ্ববতী জকিগঞ্জ থানার ঘাটের বাজারের আরেক বুঙ্গাড়ী। এইসব চোরাচালানের বখরা আদায়ের লাইনম্যানের দায়িত্ব পালন করেন কানাইঘাট থানার এসআই শাহ আলম ও এএসআই মোজাম্মেল হোসেন রিপন। তাদের মাধ্যমেই চোরাকারবারিরা মূলত থানা পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় কিছু নামধারী সাংবাদিকদের ম্যানেজ করেন। এ বিষয়ে এএসআই মোজাম্মেল হোসন রিপনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি লাইনম্যান হওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, আমি থানার সেরেস্তা ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করি মাঠে আমার কোনো দায়িত্ব নেই। আর শাহ আলমের কোন বক্তব্যই পওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাইঘাট সীমান্তের এক চোরাকারবারি জানিয়েছেন, ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য বেশি আসে বাংলাদেশে। পাচার হয় খুব কম। এরমধ্যে যেসব পণ্য ভারতে দাম বেশি এবং পাওয়া যায়না, সেগুলো বাংলাদেশ থেকে তারা নিতে আগ্রহী।

তিনি জানান, সিলেট সীমান্ত এলাকার ওপারে আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী অনেক বাজার রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি কিছু পণ্যের কদর বেশি। এর মধ্যে রসুন, স্থানীয় জাতের মাছ, সুপারি, শুঁটকি ও প্লাস্টিকের সামগ্রী অন্যতম।

Manual3 Ad Code

এদিকে কানাইঘাট থানার ওসি আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে চোরাচালান থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলায় ওপেন ভাবে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। তিনি সিলেট পুলিশ সুপার বরাবরে ওসির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে লিখিত ভাবে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগকারী উপজেলার উজান বীরদল গ্রামের জাকারিয়া আহমদ।পুলিশ সুপার বরাবরে দেওয়া অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কানাইঘাট থানার ওসি আব্দুল আউয়াল থানায় যোগদানের পর থেকে পর থেকে যত ধরনের অবৈধ কাজ আছে সবই করছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় গরু, চিনি, বিড়ি, পেয়াজ, ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা হিসাবে লক্ষ-লক্ষ টাকা আদায় করছেন। জাকারিয়া উল্লেখ করেন তার খালাত ভাই লোকমানের একটি মামলা বিষয়ে জানতে থানায় গেলে ওসি বলেন “যদি এক লক্ষ দাও তাহলে তোমার খালাত ভাইয়ের মামলা ফাইনাল রির্পোট দিয়ে দিব’। জাকারিয়াকে ওসি বলেন, এসব টাকার অংশ ‘এসপি স্যার ও ডিআইজি স্যারকে দিতে হবে”। উক্ত মামলার ফাইনাল রির্পোট দিতে প্রথমে তিনি ষাট হাজার টাকা ঘুষদেন ওসিকে। এখন ঘুষের বাকি ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য ওসি তাকে হুমকি দিচ্ছেন। উক্ত অভিযোগের বিষয়ে তিনজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন একজন এএসপি। সাক্ষীরা সকলেই ওসির ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে লিখিত সাক্ষি দিয়েছেন, সেই কপিগুলো সংরক্ষিত রয়েছে। আরো কয়েকজন অভিযোগ করেছেন তারা বিভিন্ন ঘটনায় থানায় মামলা দিয়েছেন তদন্ত করে দারোগা সত্যতা পাওয়ার পর তার এফআইআর করছেন না। কারণ ওসি খুশি না হলে মামলা রেকর্ড হবেনা।

Manual4 Ad Code

মো: আব্দুল আউয়াল ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থানায় যোগদান করেন। তার যোগদানের পর গত ৮ মাসে গড়ে প্রতিমাসে একটি খুনের ঘটনা ঘটে। এর আগে অনেকগুলো খুন সংগঠিত হলেও প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার না করায় খুন-খারাপি যেনো ডাল-ভাতে রুপ নিয়েছে কানাইঘাট থানায়। বর্তমান ওসি আব্দুল আউয়াল থানায় যোগদানের পর কানাইঘাট উপজেলায় ৮ মাসে ৯টি খুনের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ খুন হন উপজেলার ৯নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের জামায়াতের শ্রমিক সংগঠনের নেতা তিন সন্তানের জনক হাফিজ শিহাব উদ্দিন (৪৫)। এ মামলায় থেকে আসামীদের রক্ষায়ও ওসি বড় অংকের সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে। ফলে হত্যা মামলা আসামী গ্রেফতারে কানাইঘাট উত্তাল হয়ে উঠলেও ওসি ছিলেন নিরব। পরে এ নিয়ে লেখালেখি শুরু হলে সিহাব হত্যা মামলার আসামীদের গ্রেফতার করলে এখনো এজাহার ভুক্ত আসামী পালাতক রয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code