বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিতর্কিত অভিযানের মুখে নদীতে পড়ে জজ মিয়া নামের এক নিরীহ রিকশাচালকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। সহকর্মীদের বাঁচাতে এবং মৃত্যুর দায় এড়াতে মাত্র ৩৮ মিনিটের ব্যবধানে একই ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি প্রেস রিলিজ দিয়ে চরম অপেশাদারিত্ব ও জঘন্য ভোলবদলের প্রমাণ দিয়েছে পুলিশের মিডিয়া সেল।
গতকাল মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) এবং সদর ও প্রশাসনের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আফজাল হোসেনের মাধ্যমে পরপর দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রেরণ করা হয়। সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে তথ্য আদান-প্রদানের লক্ষ্যে এসএমপি কর্তৃক পরিচালিত দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘SMP media & SPC’-তে এই পরস্পরবিরোধী বিজ্ঞপ্তি দুটি প্রকাশ্যে আসতেই গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাজানো তথ্যনাট্যের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। দাপ্তরিক তথ্যের এমন অসংলগ্নতা পুলিশের সামগ্রিক অভিযান ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় ও আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, কোতোয়ালী থানা এলাকায় মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তাড়া খেয়েই নদীতে ঝাঁপ দেন জজ মিয়া এবং পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পুলিশ রাত ৮টা ৪৯ মিনিট এবং রাত ৯টা ২৭ মিনিটে পাঠানো দুটি বিজ্ঞপ্তিতে যে কাণ্ডজ্ঞানহীন ভেলকিবাজি দেখিয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছতাকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ দাবি করে, কানিশাইল খেয়াঘাট এলাকায় ‘শিলং তীর’ জুয়াড়িদের ধরতে অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৩৮ মিনিট পর দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাস্থল বদলে ফেলা হয় কানিশাইল ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন মারুফের দোকানের ভেতরে এবং জুয়ার ধরন দেখানো হয়েছে ‘অনলাইন জুয়া’।
প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ৪-৫ জন দৌড়ে পালায় এবং জজ মিয়া নদীতে ঝাঁপ দেন। অথচ দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে নিজেদের ধোয়া তুলসীপাতা দাবি করে দেখানো হয়েছে দোকানে মোহন ও রাজা নামের দুজনকে আটকে তল্লাশি করার সময় নাকি এক অজ্ঞাত ব্যক্তি এসে ডিবির টিম ইনচার্জ (এসআই) শেখ মোঃ মিজানুর রহমানকে জানায় যে খেয়াঘাটে পুলিশ দেখে ভয়ে একজন পানিতে লাফ দিয়েছে।
মৃত্যুর দায় এড়াতে প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে তড়িঘড়ি করে জজ মিয়ার ‘পূর্বের হৃদরোগ’ থাকার দাবি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে সেই হৃদরোগ ও রিকশাচালক পেশার কথা বেমালুম গায়েব করে পুলিশ দেখায়, নদীর তীর থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে জরুরি বিভাগে নেওয়ার পরই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে জজ মিয়ার বয়স ৬০ বছর এবং ঠিকানা শামীমাবাদ (স্থায়ী: বাদঘাট) উল্লেখ করা হলেও, দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে বয়স দেখানো হয় ৫৮ বছর এবং ঠিকানা বদলে কানিশাইল (স্থায়ী: কান্তাল) দেখানো হয়েছে।
দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ হঠাৎ এক চাঞ্চল্যকর দাবি তোলে ভিকটিমকে উদ্ধারের সুযোগে উত্তেজিত জনতা নাকি আটক দুই জুয়াড়িকে মোবাইলসহ পুলিশের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ডিবির মতো সুপ্রশিক্ষিত একটি বাহিনীর হেফাজত থেকে আসামি ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর বিষয় প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে কেন গোপন রাখা হয়েছিল? তা নিয়ে জনমনে তীব্র হাসির খোরাক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তরফ থেকে একই মৃত্যুর ঘটনায় এমন সাংঘর্ষিক ও বানোয়াট বয়ান প্রমাণ করে, জজ মিয়ার মৃত্যুর দায় আড়াল করতেই তড়িঘড়ি করে এই দুটি বিজ্ঞপ্তি নামক ভেলকিবাজির গল্প সাজানো হয়েছে। জুয়া অভিযানের নামে একজন নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে প্রেস রিলিজের ভেলকিবাজি দেখানোর এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের স্পষ্ট দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পুলিশের সাজানো নাটকের মুখোশ উন্মোচনে অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।