স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট: বৃহত্তর সিলেটের মানুষের শেষ ভরসাস্থল সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন আর কোনো চিকিৎসালয় নেই, এটি পরিণত হয়েছে এক অভিনব ‘টোল প্লাজায়’। সরকারি এই হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও, এখানে পা রাখলেই রোগীর স্বজনদের পকেট কাটার গ্যারান্টি মিলছে। আর এই জিম্মিদশার মূল কারিগর হাসপাতালেরই কিছু অসাধু ওয়ার্ডবয়, আয়া ও নার্সদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
দুর্নীতির এই মহোৎসবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হাসপাতালের লেবার ওটি এলাকা। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয় শামীম একাই যেন একশ। অপারেশন শেষে একজন রোগীকে ট্রলি বা হুইলচেয়ারে করে বেডে পৌঁছে দেওয়ার মতো সরকারি ডিউটি সে পালন করে স্রেফ চম্পা রঙের নোটের বিনিময়ে। ট্রলির চাকা ঘোরানোর রেট নির্ধারণ করা আছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। রোগীর অবস্থা একটু জটিল হলে এই অঙ্ক গিয়ে ঠেকে ৫০০ টাকায়। শামীমের পকেট ভারী না করলে মুমূর্ষু রোগীকেও ট্রলিতে ওঠার সুযোগ মেলে না।
অন্যদিকে ডেলিভারি ওয়ার্ডে চলছে আয়া জাহানারার একচ্ছত্র রাজত্ব। সন্তান প্রসবের মতো অতি সংবেদনশীল সময়েও স্বজনদের আবেগ নিয়ে চরম ব্যবসায় মেতে উঠেছেন এই নারী। প্রসূতি মায়ের স্বজনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় তার নিত্যদিনের কাজ। কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেলে নবজাতকের মুখ দেখারও সুযোগ দেন না তিনি। মায়ের বুক খালি থাকুক বা ভরা, জাহানারার পকেট পূর্ণ হওয়াই যেন এই ওয়ার্ডের অলিখিত আইন।
রোগীদের জিম্মি করার এখানেই শেষ নয়। লেবার রুমের ভেতরে কর্মরত প্রত্যেক আয়ার রয়েছে একটি করে গোপন আলমারি, যা ব্যবহৃত হয় চোরাই ওষুধের গুদাম হিসেবে। সিজার বা জরুরি জটিল অপারেশনের রোগী এলে নার্স ও আয়াদের যোগসাজশে শুরু হয় আরেক ভয়াবহ প্রতারণা। চিকিৎসকরা অপারেশনের জন্য একটি ওষুধ লিখতে বললে, নার্সরা স্লিপে লেখেন দুটি। অতিরিক্ত ওষুধটি আয়াদের আলমারিতে মজুত করা হয়। পরবর্তীতে এই চুরি করা ওষুধই আবার চুক্তিতে অন্য রোগীর কাছে বিক্রি করে এই চক্র।
এই পুরো সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রশ্রয়দাতা ও ভাগীদার খোদ ওয়ার্ড মাস্টার জীবন। চুরি করা ওষুধের টাকার বড় একটি ভাগ যায় জীবনের পকেটে। এছাড়া ওটিপিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে কর্মরত ওয়ার্ডবয়দের কাছ থেকে দৈনিক ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জীবনকে চাঁদা দেওয়ার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও অসংখ্য ওয়ার্ডবয়ের ভিডিও প্রমাণ ইতিমধ্যেই সংরক্ষিত রয়েছে, যা কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায়।
সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত একটি সরকারি হাসপাতালে এমন হরিলুট চললেও যেন দেখার কেউ নেই। কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে চোখ বন্ধ করে আছে। রোগী ও স্বজনরা এখানে আসেন সুস্থ হওয়ার আশায়, কিন্তু পদে পদে তাদের হতে হয় এই চাঁদাবাজ চক্রের জিম্মি।
ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজের এখন একটাই দাবি, অবিলম্বে এই অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত হোক। শামীম, জাহানারা ও জীবনের মতো দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে সেবা নেওয়ার নিয়মকানুন ও অভিযোগ কেন্দ্র দৃশ্যমান করতে হবে।
অসুস্থ শরীরে হাসপাতালে এসে সাধারণ মানুষকে আর কত জিম্মি হতে হবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এই সিন্ডিকেট ভাঙতে জেগে উঠবে, নাকি এভাবেই সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাবে দুর্নীতিবাজরা?