বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তজুড়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের নাম ভাঙিয়ে এবং প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর চোরাচালান ও চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য। এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের অঘোষিত সম্রাট এবং তথাকথিত ‘লাইনম্যান’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন একসময়ের সাধারণ ট্রাক্টর চালক নুরুজ্জামান ওরফে ‘ট্রাক্টর নুরু’। অভিযোগ উঠেছে, খোদ জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ এবং অ্যাডমিন আনোয়ারের প্রত্যক্ষ মদদে মাসিক ৫ লাখ টাকার অলিখিত ইজারায় পুরো সীমান্তকে নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে নুরুর এই বেপরোয়া সিন্ডিকেট।
গোয়াইনঘাটের বিছানাকান্দি ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে এই সুসংগঠিত চাঁদাবাজি। প্রতিটি চোরাই পণ্যের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা। পণ্যবাহী কোনো চালক বা মালিক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নুরু হুংকার করে বলেন, “জেলা ডিবির ওসি আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারকে মাসের ১ তারিখে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। চুপচাপ টাকা দেন, নইলে ডিবির হাতে তুলে দেব।” চাঁদা না দিলে নুরুর ইশারায় ডিবি পুলিশ দিয়ে মালামাল আটক করে হয়রানিমূলক মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। নুরুর এই সিন্ডিকেটে এমন অনেক সদস্য সক্রিয়, যারা পূর্বে ভারতীয় চিনিসহ বিভিন্ন চোরাচালান মামলায় কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।
মাত্র চার বছর আগেও নুরুজ্জামান নুরুর পরিচয় ছিল একজন খেটে খাওয়া ট্রাক্টর চালক। কিন্তু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেট জেলা ডিবি পুলিশের সাবেক বিতর্কিত ওসি ইকবাল হোসেন এবং সাবেক ওসি রেফায়েতের ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ শুরু করার পর থেকেই তার উত্থান ঘটে জাদুর মতো। রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া নুরু নিজ এলাকায় নির্মাণ করেছেন সুবিশাল অট্টালিকা। গত ৬ জুন জালালাবাদ থানার উমাইরগাঁওয়ে আটক হওয়া ১৪ ট্রাক ভারতীয় চোরাই চিনির মূল হোতাও ছিলেন এই নুরু। আদালতে গ্রেপ্তারকৃতদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসে, ট্রাকগুলো ভাড়া করেছিলেন নুরু এবং এর মধ্যে একটি ট্রাকের মালিক তিনি নিজেই।
সিন্ডিকেটটি কেবল চাঁদাবাজি করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, জব্দকৃত মালামাল আত্মসাতেরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটে নুরুর ইশারায় এবং ওসি আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারের নির্দেশনায় আঙ্গারজুর গ্রামের হরমান আলীর বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অভিযানে ৯৮ বস্তা ভারতীয় বাসমতী চাল এবং ৪৫ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। কিন্তু এসআই মো. সেলিম আহমেদ বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় (নং- ১৮) জব্দ দেখানো হয় মাত্র ৬৫ বস্তা চাল ও ২৫ বস্তা জিরা। সরিয়ে ফেলা ৩৩ বস্তা চাল এবং ২০ বস্তা জিরা নুরুর মাধ্যমে জৈন্তাপুরের ডিবি পুলিশের আরেক লাইনম্যান ও এক বিএনপি নেতার পুত্রের হাত ধরে বিক্রি করা হয়। এই মামলায় নুরুর পূর্ব বিরোধের জেরে কোম্পানীগঞ্জের জুবেল মিয়া এবং আঙ্গারজুরের হরমান আলীকে আসামি করে ফাঁসানো হয়।
এই চোরাকারবারি চক্রটি অসাধু রাজনীতিকদের সাথে গভীর আঁতাত গড়ে তুলেছে। নুরুজ্জামান নুরু মূলত সিলেট জেলা পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী হেনা বেগমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সীমান্ত দাপিয়ে বেড়ান। অন্যদিকে, সিলেট জেলা বিএনপির এক নেতা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার দম্ভোক্তি করে চোরাকারবারিদের অভয় দিচ্ছেন। মাস শেষে আদায়কৃত চাঁদার একটি মোটা অংশ তার পকেটেও যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি গত ৮ আগস্ট মুন্সিবাজার এলাকায় নুরুর ২২ লাখ টাকার চোরাই পণ্যবাহী দুটি নৌকা ডাকাতদের কবলে পড়লেও, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে তা ফেরত আনেন নুরু। ভারত থেকে অবৈধপথে আসা গরু, মহিষ, মোটরসাইকেল, কসমেটিকস, চিনি, জিরা থেকে শুরু করে যাবতীয় পণ্য ঢুকছে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে, আর প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা তুলছে নুরু সিন্ডিকেট।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের অ্যাডমিন আনোয়ারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘লাইনম্যান’ থাকার কথা অস্বীকার করে বিগত দিনের অভিযানের সাফাই গান। তবে মাসিক ৫ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তড়িঘড়ি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ডিবির ওসি আলী আশরাফ ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত নুরুজ্জামান নুরু নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও, মাত্র চার বছরে ট্রাক্টর চালক থেকে কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন? এমন প্রশ্নের মুখে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানিয়েছেন, চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দিনের পর দিন এই ‘ট্রাক্টর নুরু’ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন? অবিলম্বে এই চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
Leave a Reply