মোঃ রায়হান হোসেন: আইন-শৃঙ্খলার রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষক হয়ে ওঠেন, তখন ভেঙে পড়ে পুরো প্রশাসনিক আস্থা। ঢাকা জেলা পিবিআই এবং সিলেটের শাহপরান ও মোগলাবাজার থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক কোটি টাকার ঘুষ ও চোরাচালান বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর ও অমানবিক নানা তথ্য সামনে এসেছে।
যেখানে ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা রক্ষার কথা, সেখানেই নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন ওসি মনির হোসেন। ঢাকা জেলা পিবিআই-তে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে সহকর্মীদের অমানবিক নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ঘটে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহকর্মীদের উপস্থিতিতে এক কনস্টেবলকে জুতা দিয়ে প্রহারের চেষ্টা, জটিল অস্ত্রোপচার সত্ত্বেও চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে ছুটি বাতিল এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এএসআইকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রশাসনিক কক্ষে এনে উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসাবাদের মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, জরুরি ছুটি না দেওয়ায় মইনুল হক নামের এক কনস্টেবলের বাবা চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে হাসপাতালে মারা যান।
নিজের প্রশাসনিক পদ ব্যবহার করে পিবিআই কার্যালয়ের ক্যানটিন অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে টাকা আত্মসাৎ এবং ভবনের নিচতলায় বাণিজ্যিক হোটেল চালিয়ে সরকারি রাজস্বের বিপুল ক্ষতি করার অভিযোগও দৃশ্যমান সরকারি নথিপত্রে। পিবিআই থেকে সিলেটে পোস্টিং পাওয়ার পরও বদলায়নি তাঁর এই অপরাধের প্যাটার্ন। শাহপরান ও পরবর্তীকালে মোগলাবাজার থানায় অবস্থানকালে ঘুষ-বাণিজ্য, ভারতীয় চিনি ও কমলা চোরাচালানের সিন্ডিকেটের একক নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন তিনি।
ওসির অমানবিক আচরণ ও ছুটি না দেওয়ার মাশুল দিতে হয়েছে সহকর্মীদের জীবন দিয়ে। সময়মতো ছুটি না পাওয়ায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে প্রাণ গেছে কনস্টেবল মতিন মিয়ার। ছুটি না পেয়ে গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে না পারায় কনস্টেবল মামুনুর রশিদের যমজ সন্তান আলোর মুখ দেখার আগেই ঝরে যায়। আর ২০২৫ সালে ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ব্রেইন স্ট্রোক করে মারা যান এএসআই তোতা মিয়া।
এএসআই তোতা মিয়ার স্ত্রী বলেন- রমজানের ঈদে ছুটি দেয় নাই, বলেছিল কোরবানির ঈদে দেবে। কিন্তু দেয়নি আমার মেয়েটা দুইটা ঈদে বাবার জন্য শুধু কান্না করেছে। অপরাধের সাম্রাজ্য থেকে অর্জিত ‘কালো টাকা’ পাঠাতেন নিজ জেলা ময়মনসিংহে। ময়মনসিংহের কাশরে তিনতলা বিলাসবহুল ভবন এবং সিলেটের শিবগঞ্জে আলিশান বাড়ির পেছনে উড়ছে এই অবৈধ অর্থের পাহাড়। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের বিকাশ এবং নগদ অ্যাকাউন্টে নিয়মিত পাচার হতো দুর্নীতির এই অর্থ। এছাড়া, অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হওয়া নারী সদস্যদের ডিউটি থেকে রেহাই দিয়ে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্বকে চরমভাবে কলঙ্কিত করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি ভারতীয় চোরাই চিনি জব্দের তথ্য গোপন করে ১০০ বস্তা চিনি আত্মসাৎ করেন তিনি। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় দৈনিক ‘সিলেটের ডাক’-এর সিনিয়র রিপোর্টার কাউসার চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাজানো বিস্ফোরক মামলায় আসামি বানিয়ে শুরু করেন ‘মামলা বাণিজ্য’।
উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশ সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন এই বিতর্কিত কর্মকর্তা। এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন আক্তার (সভাপতি, সুজন, সিলেট) জানান- সরকারি কোনো কর্মকর্তা আইনের ঊর্ধ্বে নন। অধস্তন সদস্যদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ, মিথ্যা মামলা বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষা ও প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ওসি মনিরের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং তাকে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার। প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকবে- এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।
Leave a Reply