বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা জৈন্তাপুর, কানাইঘাট এবং গোয়াইনঘাটের প্রায় ৮০টি অবৈধ ও অনিবন্ধিত পয়েন্ট দিয়ে দীর্ঘদিন যাবত চলছে অবাধ চোরাচালানের মহোৎসব। এসব দুর্গম ও অরক্ষিত সীমান্ত পথ ব্যবহার করে পার্শ্ববর্তী দেশ হতে অবিরত প্রবেশ করছে চিনি, পেঁয়াজ, চা পাতা, শাড়ি, প্রসাধনসামগ্রী, ইলেকট্রনিক ডিভাইস (মোবাইল ফোন), মোটরসাইকেল, জুতা, টায়ার, ওষুধ এবং মোটরযানের যন্ত্রাংশসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ পণ্য। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে।
স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগমতে, গত ৫ আগস্টের পর চোরাচালানে সাময়িক স্থবিরতা পরিলক্ষিত হলেও বর্তমানে দিবারাত্রি নির্বিঘ্নে চলছে এই অবৈধ কারবার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কতিপয় অসাধু নেতার প্রত্যক্ষ মদদে এবং নিয়ন্ত্রণে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। এদের ছত্রচ্ছায়ায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি), থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি সংঘটিত হচ্ছে। কতিপয় পয়েন্টে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও সরাসরি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, যার সিংহভাগই যাচ্ছে ক্ষমতাধরদের পকেটে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট জেলার মধ্যে চোরাচালান বাণিজ্যের শীর্ষে থাকা জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য। বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সুনির্দিষ্ট ‘লাইনম্যান’ হিসেবে অত্যন্ত দাপটের সহিত দায়িত্ব পালন করে আসছে এক স্বঘোষিত ছাত্রলীগ কর্মী আফাজ। জৈন্তাপুর মডেল থানার বর্তমান ওসির ছত্রচ্ছায়ায় জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের ৪১ জন চোরাকারবারিকে নিয়ে একটি সুসংগঠিত ও সুবিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে, যার অন্যতম নিয়ন্ত্রক এই আফাজ।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ৪১ সদস্যের প্রত্যেক চোরাকারবারির নিকট হতে মাসিক ২৫ হাজার টাকা হারে সর্বমোট ১০ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ওসির নামে চাঁদা উত্তোলন করে এই আফাজ। প্রতি মাসের ২ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে হরিপুর বাজার থেকে উত্তোলিত এই বিপুল অঙ্কের অর্থ তার হাত ধরেই সুজা ওসির টেবিলে পৌঁছায়।
প্রতিবেদক কর্তৃক সংগৃহীত সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের হাতে আসা কলের অডিও-ভিডিও রেকর্ড পর্যালোচনায় এর অকাট্য সত্যতা মিলেছে। প্রাপ্ত ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয় যে, জৈন্তাপুরে পূর্ববর্তী ওসিদের ন্যায় বর্তমান ওসির সাথেও আর্থিক লেনদেন ও চাঁদা আদায়ের কথোপকথন ধুরন্ধর আফাজ স্বয়ং গোপনে ধারণ করে রাখত। প্রাথমিক ধারণামতে, ওসিরা যেন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারেন, সেই হীন উদ্দেশ্যেই ওসিদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এসব প্রমাণাদি সে সংগ্রহ করত। তবে পরিহাসের বিষয়, অন্যের জন্য পাতা নিজের ফাঁদেই কাবু আফাজ।
সচেতন মহলে বর্তমানে একটিই প্রশ্ন জোরালোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে, মাসিক এই দশ লক্ষাধিক টাকার মাসোহারা কি কেবল ওসির পকেটেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকটও এর ভাগবাটোয়ারা পৌঁছায়? এদিকে, দীর্ঘ অনুসন্ধানে আফাজের অন্যতম নেপথ্য মদদদাতা ও শেল্টারদাতা হিসেবে ফারুক নামক এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার নামও উঠে এসেছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল রবিবার (১৬ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে অভিযুক্ত চোরাকারবারি আফাজের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল গ্রহণ করেননি। একইভাবে, জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো হলেও তার দিক থেকেও কোনো সাড়া পায়নি প্রতিবেদক।
Leave a Reply