সিলেটে চোরাই বাণিজ্যে বিএনপি নেতা রুস্তমের উত্থান, প্রশ্নবিদ্ধ শিবেরবাজার ফাঁড়ি | তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

সিলেটে চোরাই বাণিজ্যে বিএনপি নেতা রুস্তমের উত্থান, প্রশ্নবিদ্ধ শিবেরবাজার ফাঁড়ি

সিলেটে চোরাই বাণিজ্যে বিএনপি নেতা রুস্তমের উত্থান, প্রশ্নবিদ্ধ শিবেরবাজার ফাঁড়ি

Manual2 Ad Code

তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: দেশের উত্তর পুর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সিলেট। জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে, আমদানী নিষিদ্ধ, শুল্ক ফাঁকির পন্য অবৈধ পথে দেশে ঢোকানোর রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে, চোরাকারবারিদের নিয়ে আসা গরু, মহিষ, চকলেট, জিরা, পেয়াজ, চিনি, ঔষধ এবং মাদক দ্রব্য প্রবেশ করে দেশে। অবৈধ এসব পণ্য এবং চোরাকারবারিদের পরিবহন ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর। আবার এসব অবৈধ কাজে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কিছু কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা মাঝেমধ্য ওঠে আসে সংবাদ মাধ্যমে। প্রতিদিনই জেলার কোথাও না কোথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে পন্য সহ চোরাকারবারিরা আটক-গ্রেফতার হন। সিংহভাগ অবৈধ এসব পণ্যর একটা অংশ, সিলেট-ভোলাগঞ্জ, সিলেট-জাফলং, সিলেট-জকিগঞ্জ এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক দিয়ে জেলার পাইকারি ও খোঁচরা বাজারে পৌঁছে যায়। আরেকটা অংশ চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এরমধ্য সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের বাইপাস, নগরের তেমুখী-শিবেরবাজার, সালুটিকর সড়ক চোরাকারবারিদের পছন্দের তালিকায়। নগরের জালালাবাদ ও শিবের বাজার পুলিশ ফাড়ির আওতাধীন এই সড়কে, গেল বছরগুলোতে কোটি কোটি টাকার চোরাই পণ্যর চালান আটক হওয়ার নজির রয়েছে।

Manual4 Ad Code

দেশে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে জেলার এই সড়কটি চোরাকারবারিদের নিরাপদ জোন হিসেবে খ্যাতি পায়। ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার আন্দোলনের ফলে, দেশের শাসনের পটপরিবর্তন ঘটলে, চোরাকারবারিরা কিছুটা থমকে যায়। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে সিন্ডিকেট গুলো আবারও সক্রিয় হতে শুরু করে। অবৈধ এ বানিজ্যে যোগ হতে থাকে নতুন নতুন মুখ। নগর ও সদরের পশ্চিম-উত্তর তেমুখী-শিবেরবাজার-সালুটিকর সড়কের আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার সড়ক পথ। যেখানে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আগে জড়িত ছিল, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীরা। ২৪শের ৫ আগস্ট পর সেই অবস্থানটির নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। ক্ষেত্র বিশেষ কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা মিলে চলছে চোরাই পণ্যের বানিজ্য, সুত্র বলছে একসময় বিএনপির যেসকল নেতাকর্মীরা বাড়ি-ঘরে ঠিকমত সময় দিতে পারতেন না, এখন তারাই ফাড়ি ও থানা পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের মেনেজ করে, চোরাচালানের বানিজ্যে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন। সাথে সুযোগ করে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের, চোরাই পণ্যের বানিজ্য অব্যহত রাখতে।

এদিকে, নিরাপদ পন্য পরিবহন নিশ্চিত করতে চেঙ্গেরখাল নদীর বাদাঘাট ব্রীজ থেকে এই সড়ককে দুটি অংশে ভাগ করে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। লাইনম্যান, পুলিশের সোর্স এবং ডিউটি পার্টি তিনটি ধাপে পুলিশকে মেনেজ করে চলছে রমরমা চোরাই পণ্যের বানিজ্য। আবার এদের শেল্টারে কাজ করছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক পদ-পদবীর নেতারা। প্রথম ধাপে সোর্স এবং চোরাকারবারির সরাসরি রফাদফায় হাত করা হয় ফাড়ি পুলিশ। তাদের গ্রীন সিগন্যাল পেলে সীমান্ত থেকে নিয়ে আসা হয় পন্য-সামগ্রী শিবেরবাজার এলাকায়। পরের ধাপ থানা পুলিশের কিছু কর্মকর্তার সিগন্যাল পেলেই পন্যবাহী গাড়িগুলো রওয়ানা হয় পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পথে পুলিশের টহল টিম (ডিউটি পার্টি) করা হয় মেনেজ। এরমধ্য বড় বড় চালান সরাসরি পাড়ি জমায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ঝামেলা এড়াতে আবার একেক এলাকায় কাজ করেন একাধিক লাইম্যান। এদেরমধ্য বেশিরভাগ রাজনৈতিক কর্মী, আছেন কেউ কেউ শেয়ার। অবশ্য এর জন্য ধাপে ধাপে কাড়িকাড়ি টাকা দিতে হয় চোরাকারবারিদের।

স্থানী সুত্র থেকে জানা গেছে, সদরের হাটখোলা ইউনিয়নের শিবের বাজার এলাকায় বিএনপি নেতা রুস্তমের নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠেছে সবচেয়ে বড় চোরাচালানের সিন্ডিকেট। সুত্রের ভাষ্যমতে ফাড়ি পুলিশ পকেটে ঢোকিয়েই রুস্তম বড় চোরাকারবারি বনে গেছেন। বাড়ি ও বাজারে রয়েছে তার চোরাই পণ্যর গোডাউন। সিএনজি মিনি ট্রাক (পিকাআপ) দিয়ে রাতে ও দিনে প্রকাশ্যে করেন চোরাই পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়। অপ্রতিরুদ্ধ রুস্তমের হাতের মুষ্টিতে রয়েছে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা। ফাড়ি ও থানা পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে রয়েছে শক্ত বন্ডিং। বাজার ও পুলিশের সাথে ঘুরতে দেখা যায় প্রায়ই। অন্যান্য বাহিনীর অভিযানের খবর পৌঁছে যায় আগেই তার কাছে। চোরাই বানিজ্যে একচ্ছ নিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলা রুস্তম, বেপরোয়া অন্যান্য কারবারিদের কাছে। তার নির্দেশনার বাহিরে গিয়ে অন্য কেউ লাইন চালাতে পারেন না। অমান্য করলে নির্দেশনা, পন্য সহ চালান ধরিয়ে দেয়া হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

অন্যদিকে চলতি বছর, চোরাচালানের বিরুদ্ধে জালালাবাদ থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচালিত কয়েকটি অভিযান থেকে দেখা গেছে, এসএমপির ডিবি পুলিশ দুটি অভিযানে দুই ব্যক্তি গ্রেফতার সহ প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকার অবৈধ মালামাল আটক করে, এর মধ্য ফাড়ির আওতাধীন হাটখোলা ইউনিয়নের পাগইল গ্রাম থেকে ২০ বস্তা পেয়াজ ও ৭ বস্তা চিনি সহ ঐ গ্রামের সমুজ আলীর ছেলে চোরাকারবারি রিমন কে গ্রফতার করা হয়। অন্যটি ফাড়ি এলাকা অতিক্রম করে আসা চোরাচালান বাহী কাভার্ডভ্যান, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে পরিচালিত ডিবি পুলিশের অভিযানে আটক হয়। সর্বশেষ ৮মার্চ প্রায় পনেরো লক্ষ টাকার ভারতীয় জিরার চালান আটক করে থানা পুলিশ। ফাড়ি এলাকা থেকে তেমুখী অভিমুখে ছেড়ে আসা অবৈধ জিরা বাহী গাড়ি, থানা এলাকা অতিক্রম করতে গেলে থানা পুলিশ সেটি আটক করে। এসময় অবৈধ ভারতীয় জিরার সাথে রাশেদ আলী নামের এক চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করা হয়। মাঝেমধ্য থানা ও ডিবি পুলিশ চোরাচালানের বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখা গেলেও ফাড়ি পুলিশের ভুমিকা নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে শিবের বাজার ও হাটখোলা ইউনিয়নের লোকজনের সাথে আলাপ কালে জানা যায়, হাটখোলা ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ড বড়কাপন গ্রামের মৃত তৈয়ব আলি বাদশার ছেলে রুস্তম আলী দীর্ঘদিন থেকে চোরাচালান বানিজ্যে জড়িত। শিবের বাজার ও বাড়িতে রয়েছে চোরাচালান পন্য রাখার গোডাউন। সিলেট সদর উপজেলা বিএনপির সহ যুব বিষয়ক সম্পাদক রুস্তম এলাকায় এখন চোরাকারবারি হিসেবে বেশি পরিচিত। আবার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পদে আছেন বোন জামাই রফিকুল ইসলাম। দলীয় ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে, ২৪শের ৫আগস্ট পর শিবের বাজার এলাকায়, চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলার মাধ্যমে তার উত্থান হয়। এটির নেটোয়ার্ক আবার গোয়াইনঘাট পর্যন্ত বিসৃত।

Manual4 Ad Code

গ্রামীণ জনপদ বেষ্টিত শিবের বাজার, বানিজ্যিক হাট বাজারের তালিকায়, সদরের হাটখোলা ও জালালাবাদ ইউনিয়ন বাসীর মধ্য প্রধান। বাজারেই রয়েছে একটি পুলিশ ফাঁড়ি। নগরের পাশে গ্রামীণ এলাকায় হওয়ায় প্রশাসনের নজর তুলনামূলক কম। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিরা অবৈধ ভাবে নিয়ে আসা ভারতীয় পণ্য বাজারে সরবরাহের পথ বেচে নিয়েছে। ফলে একদিকে বাড়ছে চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতীয় পন্য আমদানির মাত্রা, অন্যদিকে ব্যঘাত ঘটছে দেশীয় পণ্য উৎপাদন, বিক্রি ও বাজার স্থিশীলতায়।

Manual7 Ad Code

বিএনপি নেতা রুস্তম অভিযোগ অস্বীক্ষার করে বলেন, তিনি চোরাচালানের বানিজ্যের সাথে জড়িত নন। ফাঁড়ি পুলিশের সাথেও তার সখ্যতা নেই। দীর্ঘদিন থেকে বিএনপির রাজনীতির সাথে রয়েছেন। এরজন্য আওয়ামী লীগের রোষানলেও নাকি থাকে পড়তে হয়েছে। তবে কারা শিবের বাজার ও এই সড়ক এলাকায় চোরাচালান বানিজ্য গড়ে তুলেছে? জানতে চাইলেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি।

Manual7 Ad Code

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গনমাধ্যম) মোঃ মনজুরুল আলম বলেন, চোরাচালান বন্ধে পুলিশ সবসময় সোচ্চার, এর পরেও চোরাকারবারিরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঝেমধ্য কিছু পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসে। এটিও বন্ধে পুলিশের অভিযান চলমান। এছাড়া তথ্য প্রমাণ প্রাপ্তি এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ফাঁড়ি পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code