বিশেষ প্রতিবেদক: শিক্ষা কিংবা পেশাগত যোগ্যতা নয়, অর্থ আর চাতুর্যের জোরেই সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) একের পর এক ডিঙানো যায় বিধি-নিষেধের দেয়াল এমনই এক নজিরবিহীন ও জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মো. সেলিম মিয়া। মাত্র অষ্টম শ্রেণী পাস হয়েও সিসিকের কিছু অসাধু ও নীতিভ্রষ্ট কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন তিনি। অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে যাওয়া এই কর্মকর্তার জালিয়াতির খতিয়ান এখন সিসিকের প্রকৌশল শাখার প্রধান আলোচ্য বিষয়। টাকার কাছে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা যেখানে কোণঠাসা, সেখানে সেলিম মিয়ার মতো প্রতারকের জয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে খোদ সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দেড় দশক পূর্বে জাল সনদ ও ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার নথিপত্র দাখিল করে সিসিকে ‘ট্রেসার’ পদে চাকরিতে যোগদান করেন সেলিম মিয়া। সিসিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি বিধিমালা-২০০৮ (খসড়া) অনুযায়ী, ‘ট্রেসার’ পদটি একটি সম্পূর্ণ ‘ব্লক পোস্ট’, যেখান থেকে কোনো ধরনের পদোন্নতির আইনি সুযোগ নেই। অথচ যোগদানের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করে তিনি ‘কার্য সহকারী’ পদে পদায়ন লাভ করেন। উল্লেখ্য, সিসিকের বিধিমালা অনুযায়ী এই পদের জন্য ন্যূনতম স্নাতক বা ডিগ্রি পাস হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সেলিম মিয়ার ক্ষেত্রে সেই নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। কার্যসহকারী পদের দায়িত্ব পাওয়ার পরই সেলিম মিয়ার সামনে উন্মোচিত হয় অবৈধ অর্থ উপার্জনের একচ্ছত্র পথ। নিজের আওতাধীন বিভিন্ন ওয়ার্ডের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন। সেই দুর্নীতির টাকায় পুনরায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বশীভূত করে ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূতভাবে বাগিয়ে নেন ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ। বিধি মোতাবেক এই পদের জন্য ‘ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ সনদ থাকা আবশ্যিক, যা সেলিম মিয়ার অধরাই ছিল। বর্তমানে এই চতুর কর্মকর্তার লক্ষ্য সিসিকের ‘সহকারী প্রকৌশলী’ পদ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবারও মোটা অঙ্কের অর্থ ও ভুয়া বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ প্রদর্শন করে প্রমোশনের জোর লবিং চালাচ্ছেন তিনি, এবং এই দৌড়ে তদবিরের জোরে তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
এহেন নজিরবিহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে সচেতন সিলেটবাসীর মনে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কীভাবে এমন জালিয়াতি বছরের পর বছর ধরে বহাল রইল, তা নিয়ে উঠছে শত কোটি টাকার প্রশ্ন। জানা গেছে, এই অনিয়মের সুষ্ঠু বিচার ও প্রশাসনিক তদন্তের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সিসিক প্রশাসক বরাবর তিনটি পৃথক লিখিত অভিযোগ প্রেরণের প্রস্তুতি চলছে। সিসিকের একটি বিশেষ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলিম মিয়ার এই দুর্নীতির খবরটি বর্তমান সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অভিযুক্ত সেলিম মিয়াকে প্রশাসকের কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন দেখার বিষয়, এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, নাকি পূর্বের ন্যায় এবারও ধামাচাপা পড়ে যায় এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ইতিহাস।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সিসিক পাড়ায় তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। জালিয়াতির এই মহোৎসবের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সেলিম মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার নম্বরটি অনবরত ব্যস্ত পাওয়া যায়।
Leave a Reply