এয়ারপোর্টে জব্দকৃত ৬০ বস্তা জিরা কার পেটে? | তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ অপরাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি:

জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকায় সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে।

এয়ারপোর্টে জব্দকৃত ৬০ বস্তা জিরা কার পেটে?

এয়ারপোর্টে জব্দকৃত ৬০ বস্তা জিরা কার পেটে?

Manual2 Ad Code

মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) এয়ারপোর্ট থানা যেন এখন অপরাধ দমনের পরিবর্তে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও চোরাচালানের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। থানা পুলিশের দুর্নীতির আরেকটি নগ্ন ও নির্লজ্জ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে লুসাইন গ্রামের আলোচিত ‘জিরা কাণ্ড’।

স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, গত আগস্ট মাসে লুসাইন গ্রামের সফিক মিয়ার ছেলে কামালের বসতঘরে ভারতীয় চোরাচালানের ৬০ বস্তা অবৈধ জিরা মজুতের সন্ধান পায় পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন থানার এসআই মোহাম্মদ সরওয়ারদী। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অভিযান চলাকালেই স্থানীয় কতিপয় অসাধু রাজনীতিবিদ ও চিহ্নিত চোরাকারবারিরা দৃশ্যপটে হাজির হন এবং এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুর রহমানের সাথে মোটা অংকের আর্থিক রফাদফা করেন।

Manual8 Ad Code

ওসির প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এবং কথিত রাজনীতিবিদদের চাপে এসআই সরওয়ারদী লোকদেখানো মাত্র ৫ বস্তা জিরা জব্দ দেখিয়ে থানায় নিয়ে যান। বাকি ৫৫ বস্তা জিরা পরদিন থানায় হস্তান্তর করা হবে এমন হাস্যকর আশ্বাসে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ৫৫ বস্তা জিরা থানায় হস্তান্তর কিংবা লোক দেখানো জব্দ ৫ বস্তা জিরার এ ঘটনায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি। মোটা অংকের কালো টাকার বিনিময়ে ওসি শহিদুর রহমান ও এসআই সরওয়ারদী মিলে এই বিশাল পরিমাণ অবৈধ জিরার চালানটি ধামাচাপা দিয়ে রীতিমতো ‘হজম’ করে ফেলেছেন। চাঞ্চল্যকর এই ৬০ বস্তা জিরা আত্মসাৎ কাণ্ডের ভিডিও ফুটেজসহ যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে ‘তদন্ত রিপোর্ট’ কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।

এদিকে, জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) “খাদিমনগরে বালুখেকোদের পাহারায় পুলিশ: ভাগ পাচ্ছে ওসিও!” (ধারাবাহিক পর্ব নং-০২) শিরোনামে একটি তথ্যবহুল ও সাহসী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর অবশেষে টনক নড়েছে প্রশাসনের। ওই প্রতিবেদনে তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছিল কীভাবে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে ও মাসোহারার বিনিময়ে খাদিমনগরে নদী ও ছড়া গিলে খাওয়ার মহোৎসব চলছে।

সংবাদটি প্রকাশের পর সিলেটের সর্বত্র তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হলে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সিলেট সদর উপজেলার ৩ নং খাদিমনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন ছড়া ও ঘাটে সাঁড়াশি অভিযান চালান সিলেট সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শিহাব সারার অভী। অভিযানে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার ৫০০ ঘনফুট অবৈধ বালু ও একটি বালুবোঝাই ট্রাক জব্দ করা হলেও, বরাবরের মতোই ‘রহস্যজনকভাবে’ ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি কোনো বালুখেকো বা সিন্ডিকেট সদস্যকে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক তথ্য, আইন অনুযায়ী অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে থানা পুলিশেরই প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও, সাপ্তাহিক ও মাসিক বখরার নেশায় বিভোর ওসি শহিদুর রহমান উল্টো ভূমি কমিশনারের অভিযানকে ব্যর্থ ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে নিজেই সিন্ডিকেটের কাছে অভিযানের আগাম খবর ফাঁস করে দেন। খোদ ওসির মাধ্যমেই খবর পেয়ে অভিযানের আগেই নিরাপদে সটকে পড়ে অপরাধীরা। ফলস্বরূপ, বিপুল পরিমাণ বালু ও ট্রাক জব্দ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করতে পারেননি ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এখানেই শেষ নয়! বালু লুটের পাশাপাশি এয়ারপোর্ট রুটে চোরাচালান বাণিজ্যের এক অন্ধকার জগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন ওসি শহিদুর রহমান। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে চোরাচালান চক্রের এক সদস্য ও থানার একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের বক্তব্যে বেরিয়ে এসেছে ওসিসহ দেড় ডজন পুলিশ সদস্যের সরাসরি চোরাচালানে জড়িত থাকার রোমহর্ষক বর্ণনা।

সূত্রের দাবি, ওসি শহিদুর রহমান এয়ারপোর্ট থানায় যোগদানের পর তাঁর গাড়িচালক কনস্টেবল শুভর মাধ্যমে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। যাঁরা আগে কখনো চোরাচালানে জড়িত ছিলেন না, তাঁদেরও ওসির প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ও নজরদারিতে থানা এলাকায় চোরাচালান কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, চোরাই পণ্যবাহী যানবাহনের নম্বর ও ছবি আগেভাগেই ডিউটিরত পুলিশ সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো, যাতে রাস্তায় কোনো বাধার মুখে পড়তে না হয়। এই ভয়াবহ সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওসির পাশাপাশি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, এসআই বিধান দেব, এসআই রহিম, এএসআই তৌহিদুল ইসলাম, এএসআই শওকত আলী, এএসআই এনামুল হক, এএসআই এমদাদুল হক, এএসআই কামরুল হাসান, এএসআই সরোয়ার হোসেন, কনস্টেবল শুভ, কনস্টেবল সুহেল, কনস্টেবল জামিল, কনস্টেবল অপু, পুলিশ সদস্য মিজান ও গাড়িচালক পনিরের বিরুদ্ধে।

তাদের পারস্পরিক যোগসাজশে দিন-রাত চোরাই পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখা হতো। বিনিময়ে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি ৩ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হতো। আদায়কৃত এই বিপুল অর্থ হাত ঘুরে ওসি শহিদুর রহমান, ওসি (তদন্ত), লাইনম্যান এবং থানাসংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে যেত। কতিপয় রাজনৈতিক মহলের কথিত আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ওসি এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন যে, একপর্যায়ে তিনি নিজেই চোরাচালান বাণিজ্যে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেন বলে সূত্রটি দাবি করেছে। পরবর্তীতে এই অপরাধ চক্র থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে চাইলে তাঁকে ওসির রোষানলে পড়ে চরম পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়।

চোরাচালান বাণিজ্যে পুলিশের ‘লাইনম্যান’ বা ক্যাশিয়ার হিসেবে পুরো এলাকায় ব্যাপক নামডাক রয়েছে হেলাল, বিলাল, রাসেল ও ছমিরের। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা শুধু পুলিশের হয়ে চোরাই গাড়ির তথ্য আদান-প্রদান ও চাঁদা তোলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুলিশি ছত্রছায়ায় নিজেরাও চোরাই পণ্য কিনে জমজমাট বাণিজ্য পরিচালনা করছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত হেলালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, অপর তিন লাইনম্যান বিলাল, রাসেল ও ছমিরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

Manual8 Ad Code

জিরা আত্মসাৎ বিষয়ে শুক্রবার বিকেলে অভিযুক্ত এসআই সরওয়ারদীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরম অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেন। প্রথমে জিরা-মিরার কিছু জানেন না বলে অস্বীকার করলেও পরক্ষণেই স্বীকার করেন, গোপন তথ্যে এক বসতঘরে জিরা খুঁজতে গিয়ে কিছু পাননি। আবার নিজেই কথা ঘুরিয়ে বলেন, বিলাশ নামের এক ব্যক্তির হারানো জিরা উদ্ধার করতে হয়তো সেখানে গিয়েছিলেন! প্রশ্ন উঠেছে, চোরাই পণ্য জব্দ করার বদলে চোরাকারবারির হারানো মাল উদ্ধার করা কি তবে পুলিশের নতুন দায়িত্ব?

এসিল্যান্ডের অভিযানের তথ্য ফাঁস ও জিরা আত্মসাৎ বিষয়ে জানতে এয়ারপোর্ট থানার ওসি শহিদুর রহমানের সরকারি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো মেজাজ হারিয়ে প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, এসবের কী প্রমাণ আছে? অপরাধ ঢাকতে গণমাধ্যমকর্মীকে ওসির এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আজগুবি পাল্টা প্রশ্ন কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েই এখন জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাই রাষ্ট্রীয় শপথ ভেঙে অপরাধীদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছেন, সেখানে শুধুমাত্র ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে কি খাদিমনগরের প্রকৃতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা পাবে? অবিলম্বে ওসি শহিদুর রহমানসহ অভিযুক্ত দেড় ডজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

​পর্ব-০৫ এ যা থাকছে, বখরা পেরিয়ে এবার সরাসরি লগ্নি! চোরাচালান সিন্ডিকেটে ওসি শহিদুরের ৪০ লক্ষাধিক টাকার বিনিয়োগের অকাট্য প্রমাণ নিয়ে আসছে পরবর্তী পর্ব। চোখ রাখুন ‘তদন্ত রিপোর্ট’-এ।

Manual6 Ad Code

ধারাবাহিক সংবাদ নং- ০৪।

Manual2 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Comments are closed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code