মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেটের এমসি (মুরারিচাঁদ) কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। রায়ে অভিযুক্ত আট আসামির মধ্যে একজনের মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় অপর চার আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত সকলেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী।
ইতিহাসের এই জঘন্যতম ও কলঙ্কজনক অধ্যায়টি হয়তো চিরকাল আঁধারেই ঢাকা পড়ে যেত, যদি না বাবলা চৌধুরী নামক এক অকুতোভয় ব্যক্তি চরম সাহসিকতার পরিচয় দিতেন। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই নারকীয় ঘটনার কথা সর্বপ্রথম তার মাধ্যমেই জনসমক্ষে আসে। বিশ্বস্ত সূত্রে ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু ও রাজনৈতিক উচ্চপদস্থ মহলের অব্যাহত হুমকি উপেক্ষা করে তিনি সত্য প্রকাশে অটল ছিলেন।
ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে তাকে লাগাতার চাপ প্রয়োগ করা হয়, এমনকি দেওয়া হয় হত্যার হুমকিও। কিন্তু কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভন তাকে টলাতে পারেনি। বাবলা চৌধুরীর সেই দুঃসাহসিক ও অনড় অবস্থানের কারণেই আজ নিরীহ সেই গৃহবধূর মামলাটি ন্যায়বিচারের এই চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সিলেটবাসী তথা সমগ্র দেশ তার এই অসামান্য অবদানের কথা চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
মামলার এজাহার ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে শাহপরান মাজারে দর্শনার্থে গিয়েছিলেন এক নবদম্পতি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ফেরার পথে টিলাগড়স্থ এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে তারা গাড়ি থামান। স্ত্রীকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে স্বামী পার্শ্ববর্তী একটি দোকানে গেলে আকস্মিকভাবে কয়েকজন তরুণ তাদের প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে। এরপর জোরপূর্বক ওই দম্পতিকে বালুচরস্থ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবরুদ্ধ স্বামীর চোখের সামনেই গাড়ির ভেতর ২০ বছর বয়সী ওই নববিবাহিত তরুণীকে সংঘবদ্ধভাবে পাশবিক নির্যাতন করে ছয় পাষণ্ড। ধর্ষণের পর তাদের মারধর করে সর্বস্ব লুট করে এবং গাড়িটি আটকে রাখে ধর্ষকরা।
ঘটনার রাতেই ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) শাহপরান থানায় ৬ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে প্রাইভেটকারটি আটকে রেখে চাঁদাবাজির অভিযোগে আরও একটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। বিচারিক সুবিধার্থে পরবর্তীতে উভয় মামলার বিচারকার্য একযোগে পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ন্যক্কারজনক এ ঘটনার পর আসামিরা আত্মগোপনে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ ও র্যাব) সাঁড়াশি অভিযানে মাত্র তিন দিনের মাথায় এজাহারভুক্ত ছয়জনসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে আসামিরা। চাঞ্চল্যকর এ মামলার ডিএনএ (DNA) পরীক্ষাতেও আটজনের মধ্যে ছয় আসামির নমুনার সাথে ধর্ষণের আলামতের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহপরান থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। গত বছরের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়।
মামলার বিচারকার্য চলাকালে মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ভুক্তভোগী গৃহবধূ, তার স্বামী, জবানবন্দি গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সাক্ষ্যগ্রহণকালে বাদীর বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হলেও, পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও যুক্তিতর্ক শেষে আজ আসামিদের কারাবন্দী অবস্থায় এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন আদালত।
Leave a Reply