নিজস্ব প্রতিবেদক: আইনের ফাঁকফোকর গলে নয়, বরং খোদ আদালতকে রীতিমতো বোকা বানিয়ে সিলেটে চলছে জব্দকৃত গাড়ি ছাড়িয়ে নেওয়ার এক অভিনব ও ভয়ংকর প্রতারণা। জবরদখল কিংবা পুলিশের হাতে আটক হওয়া বিভিন্ন অপরাধের গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে এবার মুমূর্ষু রোগীকে ‘ভুয়া চালক’ সাজানোর মতো জঘন্য পথ বেছে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র।
ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়; নিজের অজান্তেই মামলার আসামি বা ভুয়া চালক বনে যাওয়া ভুক্তভোগী যখন এর প্রতিবাদ করছেন, তখন উল্টো তাকে দেওয়া হচ্ছে হত্যার হুমকি। সম্প্রতি সিলেটের শাহপরান এলাকায় এমনই এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে, যা নিয়ে আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নিজেই।
সিলেট মহানগরের শাহপরান (রহঃ) থানাধীন গইলাপাড়ার বাসিন্দা মো. ছালেক আহমদ (৩২) দীর্ঘদিন ধরে জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এই ব্যক্তি পেশায় কোনোদিন চালক ছিলেন না, এমনকি গাড়ি চালানোও জানেন না। অথচ এই অসুস্থ ব্যক্তিকেই ‘চালক’ সাজিয়ে আদালতে পেশ করেছে জালিয়াতি চক্র। চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে ছালেক আহমদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও নাম-ঠিকানা জাল করে পুলিশের জব্দ করা দুটি গাড়ি আদালত থেকে জামিনে ছাড়িয়ে নেয়।
আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, এই দুঃসাহসিক জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড বা মূল হোতা হলেন আইনজীবী সহকারী (মুহুরি) পরিচয়ধারী এক চিহ্নিত প্রতারক। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী চক্রের মূল কুশীলবরা হলেন- জামাল আহমদ (২৫) চক্রের গডফাদার। সে জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরের বালিপাড়ার বাসিন্দা। মুহুরি পরিচয়ের আড়ালে সে মূল মালিক ও চালকের নাম-ঠিকানা গোপন করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। ফয়সল আহমদ (৩০) শ্যামপুর এলাকার বাসিন্দা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া একটি পিকআপের (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: সিলেট মেট্রো ন-১১-২২৫৫) মালিক। নুর জাহান আক্তার নূরী (২৮) গোয়াইনঘাটের নয়ামাটির বাসিন্দা এবং অপর একটি পিকআপের (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ঢাকা মেট্রো ন-২০-৮৯১৩) মালিক। এই তিনজনের বাইরেও এজাহারে আরও ৩-৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা এই কালোবাজারি সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কাজ করছে।
নিজের নাম ব্যবহার করে এমন ভয়ংকর অপরাধের কথা লোকমারফত জানতে পেরে ভুক্তভোগী ছালেক আহমদ গত ৪ঠা আগস্ট আদালত প্রাঙ্গণে প্রধান দুই আসামির কাছে এর জবাব চান। কিন্তু নিজেদের দোষ স্বীকার করার বদলে প্রতারক চক্রটি তাকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে অবশেষে গত ৬ই আগস্ট সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি।
সিলেটের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও আমলী আদালত নং-১ এর বিচারক ফারহানা সুলতানা বিষয়টির আইনি ও সামাজিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘দ্য কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’-এর ২০০ ধারা অনুযায়ী বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। একইসঙ্গে, জালিয়াতির এই বিশাল চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলতে ২০২ ধারা অনুযায়ী পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেটকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আগামী ১লা নভেম্বর, ২০২৬ তারিখের মধ্যে পিবিআই-কে এই রোমহর্ষক জালিয়াতির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (মামলা নং: কোতোয়ালী সি.আর ৯৭২/২০২৬)। সিলেটে আইনের রক্ষকদের নাকের ডগায় বসে মুহুরি পরিচয়ে এমন ভয়ংকর জালিয়াতি সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, পিবিআই-এর গভীর তদন্তে এই জালিয়াতি চক্রের আর কত রথী-মহারথীর মুখোশ উন্মোচিত হয়।
Leave a Reply