মোঃ রায়হান হোসেন: রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন অপরাধীদের দম্ভ যে কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে, তার এক নগ্ন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো লালপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে। শীর্ষ চোরাকারবারি জয়নাল এবং নৌ পুলিশের এক সদস্যের মধ্যকার কথোপকথনের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে।
এই অডিওতে বেরিয়ে এসেছে পুলিশ প্রশাসনের অন্দরমহলের চরম পচন ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। রেকর্ডে দম্ভভরে জয়নাল স্বীকার করেছে, অর্থের জোরে লালপুর নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) সজল কুমার কানুকে সে আক্ষরিক অর্থেই নিজের হাতের পুতুলে পরিণত করেছে।
ফাঁস হওয়া অডিওর তথ্যানুযায়ী, লালপুর নৌ ফাঁড়িতে এখন চলছে ঘুষ ও দুর্নীতির মহোৎসব। আইসি সজল কুমার কানুকে ম্যানেজ করতে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা দেয় চোরাকারবারি জয়নাল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন কালেকশন খাত থেকে প্রতিদিন ৭ হাজার টাকা করে চাঁদা তোলার বিষয়টিও ওই কথোপকথনে সুস্পষ্ট হয়েছে।
চোরাচালানের পাহারাদারে খোদ পুলিশ কর্মকর্তা
পুলিশের মূল দায়িত্ব চোরাচালান রোধ করা হলেও, আইসি সজল কানু টাকার লোভে খোদ চোরাকারবারির পাহারাদারে পরিণত হয়েছেন। জয়নালের দাবি, নিজের অধীনস্থ স্টাফদের অন্ধকারে রেখে আইসি নিজেই মাঠে নেমে তার অবৈধ মালামাল পারাপার ও উদ্ধারে সরাসরি সহায়তা করেন।
এই অডিওতে জয়নালের বিশাল চোরাচালান নেটওয়ার্ক ও ঘুষের রেট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। ৩৯৮ পিস এবং ৮২৫ পিসের মতো বড় বড় চালানের কথা উল্লেখ করে জয়নাল জানায়, মাল নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছাতে ২০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায় ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছড়ানো হয়। এমনকি স্পিডবোটের লাইন ক্লিয়ার রাখতেও ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বকশিশ দেওয়া হয়।
আইসিকে পকেটে পুরে চোরাকারবারি জয়নাল এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, সে সরাসরি ওই পুলিশ কর্মকর্তাকেই হুমকি দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়। জয়নাল দম্ভ করে বলে, যেহেতু সে আইসিকে টাকা দিয়েছে, তাই তার মাল ধরলে আইসিরই ‘খবর আছে’। এমনকি টাকার জোরে আসামির তালিকা থেকে এক-দুইজনের নাম অনায়াসে বাদ দেওয়ার ক্ষমতাও সে রাখে। নিজেদের এই অবৈধ সাম্রাজ্য নির্বিঘ্ন রাখতে সাংবাদিকদেরও ম্যানেজ করার অপচেষ্টা এবং তাদের নিয়ে জয়নালের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যও ওই রেকর্ডে শোনা যায়।
একজন চিহ্নিত ও শীর্ষ চোরাকারবারির কাছে পুলিশের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অপরাধ দমনের বদলে টাকার লোভে অপরাধীর দালালে পরিণত হওয়া আইসি সজল কুমার কানু পুলিশের পবিত্র পোশাকের চরম অবমাননা করেছেন। সচেতন মহলের জোর দাবি, অবিলম্বে এই ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে দুর্নীতিগ্রস্ত এই পুলিশ কর্মকর্তা এবং শীর্ষ চোরাকারবারি জয়নালের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ধারাবাহিক সংবাদ নং- ১৪।