তদন্ত প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্ত যেন এখন চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য। আর এই অভয়ারণ্যের ‘গডফাদার’ স্বয়ং সিলেট জেলা গোয়েন্দা (ডিবি-উত্তর) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ।
জেলা ডিবির ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো সীমান্ত এলাকাকে কার্যত নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে এই অসাধু চক্র। মাসিক ৫ লাখ টাকার অলিখিত ইজারায় চলছে ওপেন চাঁদাবাজি। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকার চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের হরিলুট চললেও রহস্যজনকভাবে নির্বিকার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। সিলেট ডিবিতে (উত্তর) দুর্নীতির আরেক বরপুত্র অ্যাডমিন আনোয়ারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন ওসি আশরাফ!
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোয়াইনঘাটের ৪টি ইউনিয়নে ওসি আশরাফের ইশারায় চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে তার নিজস্ব অনুচররা। প্রতিটি পণ্যের জন্য নির্ধারিত রয়েছে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমল থেকেই এই চক্রটি ডিবির নাম ভাঙিয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে, গড়ে তুলেছে সুবিশাল সম্পদের পাহাড়। বাদ যায়নি আলোচিত ‘১৪ ট্রাক ভারতীয় চিনি কেলেঙ্কারি’ মামলার আসামিরাও; কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে তারাও ফের যোগ দিয়েছে ওসি আশরাফের এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটে।
পণ্যবাহী কোনো চালক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসে ডিবির খড়্গ। সিন্ডিকেটের লোকজন রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলে, জেলা ডিবির ওসি আশরাফ স্যারকে মাসের ১ তারিখে নিজ পকেট থেকে ২ লাখ এবং ১৫ তারিখে ক্যাশ ৩ লাখ টাকা দিতে হয়। চুপচাপ টাকা দেন, নইলে ডিবির হাতে তুলে দেব।” চাঁদা না দিলে তাদের ইশারায় ডিউটিরত পুলিশ দিয়ে মালামাল আটকে মিথ্যা মামলা ঠুকে দেন ওসি আশরাফ। কেবল চাঁদাবাজি বা মামলাই নয়, জব্দকৃত মালামাল আত্মসাতেও সিদ্ধহস্ত এই সিন্ডিকেট। ডিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ মালামাল আটক হলেও কাগজে-কলমে দেখানো হয় যৎসামান্য।
সর্বশেষ গত ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটে গোয়াইনঘাটের নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের আঙ্গারজুর গ্রামে জনৈক হরমান আলীর বাড়িতে ওসি আশরাফের নির্দেশনায় লোকদেখানো অভিযান চালায় ডিবি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অভিযানে ৫ হাজার টাকা মূল্যের ৯৮ বস্তা ভারতীয় বাসমতী চাল ও ১২ হাজার টাকা মূল্যের ৪৫ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ডিবির এসআই মো. সেলিম আহমেদ বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় (মামলা নং- ১৮) জব্দ দেখানো হয় মাত্র ৬৫ বস্তা চাল ও ২৫ বস্তা জিরা। উধাও হয়ে যাওয়া ৩৩ বস্তা চাল এবং ২০ বস্তা জিরা জৈন্তাপুর উপজেলার জেলা ডিবির আরেক লাইনম্যান ও বিএনপি নেতা আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যানের ছেলে মাসুকের হাত ধরে হরিপুর বাজারের চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিক্রিলব্ধ এই কালো টাকার ভাগবাটোয়ারা হয় ওসি আশরাফ ও মাসুকের মধ্যে।
নোয়াগাঁও ও হরিপুরেও সম্প্রতি একই কায়দায় চোরাচালানের বড় চালান আটকে নয়ছয় করা হয়েছে। এই মাফিয়া চক্রের শিকড় আরও গভীরে। চোরাকারবারিদের দাবি, সিলেট জেলা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা এই সিন্ডিকেটের অন্যতম রক্ষাকবচ। ডিআইজি, এসপিসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার দম্ভোক্তি করে চোরাকারবারিদের অভয় দিচ্ছেন তিনি।
হরিপুরের মামুন ও জাফলংয়ের নামিজ খাঁনের মাধ্যমে মাস শেষে ডিবির চাঁদাবাজির বিপুল অঙ্কের একটি মোটা ভাগ পৌঁছে যায় ওই নেতার টেবিলে। ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা গরু, মহিষ, মোটরসাইকেল, চিনি, জিরা, কম্বল থেকে শুরু করে কসমেটিকস, সবকিছুতেই চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে যখন এই ভয়াবহ দুর্নীতির বিষয়ে ওসি আশরাফের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে “বাহিরে আছি, পরে কল দিচ্ছি” বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও, নিজের অপকর্ম ধামাচাপা দিতে এক চরম ধৃষ্টতার আশ্রয় নেন তিনি।
গত শনিবার বিকেলে এক সাংবাদিকের মাধ্যমে তদন্ত রিপোর্টের সম্পাদকের কাছে ৫ হাজার টাকা ঘুষ পাঠান ওসি আশরাফ! এমনকি পত্রিকা প্রিন্টের খরচ বাবদ প্রতি সপ্তাহে আরও ১ হাজার টাকা দেওয়ারও নির্লজ্জ প্রস্তাব দেন। একজন আইন রক্ষাকারীর এমন ঘৃণ্য আচরণ গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ওসি আশরাফ ও তার সিন্ডিকেটের এই বেপরোয়া তাণ্ডবে অতি মুনাফালোভী চোরাকারবারিদের দাপটে নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে, দুর্নীতিগ্রস্ত এই কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে জেলা ডিবির সৎ ও সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মাঝেও ভেতরে ভেতরে চরম অসন্তোষ ধিকিধিকি জ্বলছে। এই দুর্নীতিবাজ চক্রের লাগাম টেনে ধরতে এবং ওসি আশরাফের বিরুদ্ধে এখনই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন সিলেটের সচেতন মহল।