মোঃ রায়হান হোসেন: রাষ্ট্রের বিচার ও আইনি কাঠামোর অন্যতম সংবেদনশীল অংশ হলো কারাগার, যার মূল উদ্দেশ্য অপরাধীদের সংশোধন ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২ বর্তমানে বন্দীদের সংশোধনাগারের পরিবর্তে এক অসাধু বাণিজ্য, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
এমন অপ্রতিরোধ্য অনিয়ম ও চরম দুর্নীতির নেপথ্যের মূল কারিগর হিসেবে অভিযোগের তির উঠেছে বর্তমান জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের দিকে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে তার এসব অপকর্ম ফাঁস হলে তিনি নিয়মতান্ত্রিক পথে না হেঁটে অনুমোদনহীন ফেসবুক লাইভে এসে সমগ্র সাংবাদিক সমাজকে ঢালাওভাবে অপমান করার মতো চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন।
কারাগার থেকে সদ্য কারামুক্ত বন্দী ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জাবেদ হোসেনের যোগদানের পর থেকে কারাগারে প্রকাশ্যে অনিয়মের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওকালতনামা বাণিজ্য। আদালত থেকে আসা প্রতিটি ওকালতনামায় স্বাক্ষরের জন্য বন্দীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ২০০ টাকা আদায় করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০টি ওকালতনামা থেকে দৈনিক প্রায় ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। টাকা প্রদানে ব্যর্থ হলে ওকালতনামা গায়েব বা আটকে রাখার মতো ঘটনাও নিত্যনৈমিত্তিক।
এছাড়া, রাজনৈতিক মামলার আসামিদের জামিনের পর বিশেষ সুবিধায় দ্রুত মুক্তির জন্য ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির অভিযোগ রয়েছে। বন্দীদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ১৫ দিনের নির্ধারিত সময়ের আগে দেখা করতে হলে কারারক্ষীদের মাধ্যমে ১ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়, যার একটি বড় ভাগ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পকেটে যায়। আর ‘অফিস কল’-এ বিশেষ সাক্ষাতের জন্য বন্দীর সংখ্যা ভেদে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
পাশাপাশি কারাগারের অভ্যন্তরীণ ‘পিসির বাজার’-এ সরকারি মূল্যতালিকা থাকলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি সিট বা ওয়ার্ড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নগদ অর্থের পাশাপাশি সুবেদারদের দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট (যেমন ৫ প্যাকেট ‘বেনসন’ বা ‘ডার্বি’) ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। চড়া দাম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো বন্দী প্রতিবাদ করলে বা মুখ খুললে তাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবাদী বন্দীদের নারকেল গাছের সঙ্গে উল্টো করে বেঁধে সুবেদারদের মাধ্যমে লাঠি দিয়ে বর্বরোচিত প্রহার করা হয়, যা অনেক সময় স্বয়ং জেলারের উপস্থিতিতেই ঘটে থাকে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে তার এসব দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর জেলার মো. জাবেদ হোসেন চরম স্পর্ধা প্রদর্শন করেছেন।
তথ্যমতে, তিনি সত্যতা যাচাই ছাড়াই সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগ তুলেছেন এবং লাইভে এসে ক্ষমতা ও দম্ভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তবে সাংবাদিক মহল মনে করে, তার এই দাম্ভিকতা চূর্ণ হয়ে এবং তার গোপন অপকর্মের মুখোশ এখন জনসমক্ষে।
জেলার জাবেদ হোসেনের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুর্নীতির অভিযোগ তার নিত্যসঙ্গী। ইতিপূর্বে খুলনা ও পিরোজপুর জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনকালেও ক্যান্টিন দুর্নীতি, সিট বাণিজ্য, ভিআইপি সেলের বন্দোবস্ত ও সরকারি খাদ্য বরাদ্দ আত্মসাতের দায়ে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। এমনকি ২০১৮-২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলার থাকাকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্তে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। তৎকালীন তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করলেও, দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি না দিয়ে কেবল এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে ‘বদলি’ করেই তাকে পার পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সংবেদনশীল এই সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও বন্দীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি