বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার ও কালীঘাট এলাকা। সারাদিন কর্মব্যস্ততায় মুখর এই জনপদ এখন এক অদৃশ্য বিষবাষ্পে আক্রান্ত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর এবং ছিন্নমূল মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে ‘তীর শিলং’ নামক এক মরণনেশা জুয়া। আর এই অবৈধ ব্যবসার নেপথ্যে যার নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তিনি হলেন সালমান নামের এক ব্যক্তি। একসময়ের সাধারণ কলা বিক্রেতা সালমান কীভাবে আজ কোটি টাকার মালিক হলেন, তা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র রহস্য ও ক্ষোভ।
দীর্ঘদিন বন্দরবাজার এলাকায় কলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন সালমান। অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত সালমানের অর্থনৈতিক অবস্থায় হুট করেই পরিবর্তন আসে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎস ছাড়াই অতি অল্প সময়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন তিনি। রাতারাতি বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাওয়ার এই ঘটনাকে অনেকেই ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার সাথে তুলনা করছেন। আর এই অলৌকিক উন্নতির পেছনেই রয়েছে কালীঘাট কেন্দ্রিক তীর শিলংয়ের অবৈধ কারবার।
নগরীর কালীঘাট এলাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সালমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে তীর শিলংয়ের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দিনমজুর, রিকশাচালক এবং নিম্নবিত্ত মানুষকে লক্ষ্য করে এই জুয়া চালানো হচ্ছে। প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে প্রতিদিন শত শত মানুষের ঘামের টাকা কেড়ে নিচ্ছে এই চক্রটি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই জুয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে অনেকে তাদের সংসার ও সর্বস্ব হারিয়েছেন। অনেক পরিবার এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। খেটে খাওয়া মানুষগুলো তাদের দৈনন্দিন উপার্জনের সিংহভাগই এই খেলায় খুইয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। পরিবারে অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার মতো করুণ চিত্র এখন কালীঘাট এলাকার অনেক পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোতোয়ালি মডেল থানা ও বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির খুব কাছেই এই অবৈধ কার্যক্রম চললেও তা দমনে নেই দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সালমান একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় নিজেকে সুরক্ষায় রেখেছেন। এই ক্ষমতার দাপটেই তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন এই অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মুখ বন্ধ রাখার কৌশল অবলম্বন করায় কেউ প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না।
তবে এসব বিষয়ে বক্তব্য সংগ্রহ করতে অভিযুক্ত কলা বিক্রেতা সালমানের ব্যবহৃত নাম্বারে যোগাযোগ করলে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে বছরের পর বছর ধরে একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলতে পারে, তা নিয়ে জনমনে ক্ষোভের দানা বেঁধেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, সালমানের এই হঠাৎ উত্থান এবং তীর শিলংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সম্পদ লুন্ঠনের বিষয়টি যদি এখনই বন্ধ করা না হয়, তবে পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশ আরও চরম অবনতির দিকে যাবে।
সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীরা এখন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা দ্রুত সালমান এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের আইনের আওতায় এনে এই মরণনেশা তীর শিলং বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আইন কি শুধু নিম্নবিত্তের জন্যই? প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থাকা এই ‘কলা বিক্রেতা’ কি আইনের উর্ধ্বে? এই রহস্যের জট খুলবে কবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
Leave a Reply