মোঃ রায়হান হোসেন: যাদের কাঁধে অপরাধ দমন ও চোরাচালান প্রতিরোধের পবিত্র দায়িত্ব, তারাই এখন চোরাকারবারিদের পাহারাদার! সিলেটের এয়ারপোর্ট–হরিপুর সড়ক ব্যবহার করে অবৈধ ভারতীয় পণ্যের রমরমা বাণিজ্যে সরাসরি মদদ দিচ্ছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) এয়ারপোর্ট থানার একদল অসাধু সদস্য। রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অপরাধীদের নিয়ে জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের চাঞ্চল্যকর অভিযোগে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। জাফলং, হরিপুর, রাধানগর ও দরবস্ত সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় অবৈধ পণ্য- জিরা, চিনি, চকলেট থেকে শুরু করে কাঁচামাল অনায়াসে তামাবিল-সিলেট সড়ক হয়ে ফতেপুর ও এয়ারপোর্ট সড়ক দিয়ে সিলেট শহরে প্রবেশ করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশকে ম্যানেজ করে এয়ারপোর্ট থানা এলাকার একটি অংশকে রীতিমতো চোরাচালানের ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ রুট হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
চোরাকারবারিদের সাথে পুলিশের এই অনৈতিক সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, প্রতিটি অবৈধ পণ্যবাহী গাড়ি পারাপারের জন্য ৩ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত রেট বা চাঁদা নির্ধারণ করা আছে। গাড়ির নম্বর আগে থেকে জানিয়ে দিলেই চেকপোস্টে মেলে নির্বিঘ্নে পারাপারের ‘ভিআইপি’ সুবিধা। এই অসাধু চক্রের শীর্ষেই উঠে এসেছে খোদ এয়ারপোর্ট থানার ওসি শহিদুর রহমানের নাম।
অভিযোগ রয়েছে, ওসি শহিদুর রহমান ছাড়াও তার গাড়িচালক শুভ, ওয়ারেন্ট অফিসার বিধান, ওসি (তদন্ত) জুনাইদ, জামিল, সোহেল, এএসআই সৌকত, গাড়িচালক পনি, এমদাদ, কামরুল, এএসআই এনামুল এবং সদ্য পুলিশ লাইনে যুক্ত হওয়া তৌহিদ সরাসরি এই চাঁদাবাজি ও চোরাচালান বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত। অবৈধ গাড়ি থেকে আদায় করা বিপুল পরিমাণ ঘুষের টাকা এই সদস্যদের হাত ঘুরে ভাগভাটোয়ারা হয়, যার একটি মোটা অংশ সরাসরি চলে যায় ওসির পকেটে।
পুলিশ ও চোরাকারবারিদের মধ্যে এই অবৈধ লেনদেন নির্বিঘ্ন করতে মাঠে রয়েছে ‘লাইনম্যান’ খ্যাত হেলাল, বিলাল, রাসেল ও ছমির। এই মধ্যস্থতাকারীরা কেবল চাঁদার টাকাই পুলিশের হাতে তুলে দেয় না, বরং নিজেরাই চোরাই পণ্যের বড় বড় চালান কিনে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
দিনের আলোতে পুলিশের নাকের ডগায় এমন প্রকাশ্য চোরাচালান চললেও থানার দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত অভিযোগের পরও পুলিশের এই নির্বিকার ভূমিকা জন্ম দিচ্ছে হাজারো প্রশ্নের। থানার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরদারি ও জবাবদিহিতা কি তবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে?
চোরাচালান দমনের দায়িত্বে থাকা পুলিশই যদি অর্থের লোভে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসকারী চোরাকারবারিদের সহযোগী হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে। অবিলম্বে বিমানবন্দর–হরিপুর সড়কে চোরাচালানের এই স্বর্গরাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে অভিযুক্ত ওসি ও জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে সিলেটের সচেতন মহল।
ধারাবাহিক পর্ব নং- ০১।