মোঃ রায়হান হোসেন: ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পদের নৈতিকতা ও আইনি এখতিয়ার নিয়ে নজিরবিহীন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক দুর্নীতি এবং চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরপরই তাঁর স্বাক্ষরিত একটি ‘গণমাধ্যম নির্দেশনামূলক’ গণবিজ্ঞপ্তি এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও আইনি বিতর্ক:
গত ২৯ এপ্রিল সিলেটপ্রেসবিডি নামক একটি অনলাইন পোর্টালে কমিশনারের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসএমপির ভেরিফায়েড পেজে সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্ট এই গণবিজ্ঞপ্তিটি প্রচার করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সংবাদ প্রবাহে দিকনির্দেশনা দেওয়ার আইনি এখতিয়ার কেবল তথ্য মন্ত্রণালয় বা আদালতের রয়েছে। পুলিশের এই ‘অতি-উৎসাহী’ পদক্ষেপকে সচেতন মহল স্বাধীন সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
বিতর্কিত গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, উধাও সংবাদ:
সম্প্রতি একটি বিতর্কিত গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে রহস্যজনকভাবে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট নিউজ পোর্টাল থেকে সংবাদটি সরিয়ে ফেলা হয়। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, অনলাইনের এই সংবাদটি কি চাপের মুখে ডিলেট করা হয়েছে নাকি পর্দার আড়ালে কোনো বিশেষ সমঝোতা হয়েছে?
সংবাদটি সরিয়ে নিলেও এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ কমেনি বরং তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত ওই সংবাদে কমিশনার বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। জনস্বার্থে এবং সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে উক্ত প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
দুর্নীতির মহোৎসব ও ‘৭১’ সংকেতের রহস্য:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কমিশনার কুদ্দুছ চৌধুরী একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। সীমান্ত অঞ্চল থেকে রাতের আঁধারে চোরাচালান নির্বিঘ্ন করতে তিনি ‘৭১’ নামক একটি বিশেষ সাংকেতিক সংখ্যা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কথিত সাংবাদিক ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি মুহিত হোসেনের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় এবং এর বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে বিপুল অঙ্কের অর্থ কমিশনারের দপ্তরে পৌঁছায় বলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পারিবারিক স্বজনপ্রীতি ও মামলা বাণিজ্য:
দুর্নীতির জাল বিস্তৃত হয়েছে কমিশনারের অন্দরমহল পর্যন্ত। পুলিশ লাইন্সের মেসগুলোতে খাদ্য সরবরাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছে তাঁর সহধর্মিণী সিদরাতুল মুনতাহার হাতে। এছাড়া ‘জিনিয়া’ নামক একটি অকার্যকর অ্যাপ প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার না করার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার তুঙ্গে। বিশেষ করে, নজরুল ইসলাম বাবুল নামক এক আসামির সাথে দুই কোটি টাকার বিনিময়ে আপোসের বিষয়টি জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
নৈতিক স্খলন ও পারিবারিক কলহ:
কমিশনারের আপন ভ্রাতা আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী স্বয়ং ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর ভাইয়ের নৈতিক স্খলন ও পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন। ২০০৩ সালে জনৈক সংখ্যালঘু তরুণীকে বলপূর্বক বিবাহের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও এখন সামনে এসেছে।
প্রশাসনের তদন্ত ও জনদাবি:
বর্তমানে এসএমপির অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র বিভাজন ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। জানা গেছে, একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে এসব অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে। সিলেটের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ এই দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কবল থেকে মুক্তি পেতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর পুলিশের এই হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। আইনবিদদের মতে, পুলিশের কাজ অপরাধ দমন করা, সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারণ করা নয়।
Leave a Reply