মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেটের পর্যটন ও সীমান্তবেষ্টিত উপজেলা গোয়াইনঘাটের পিয়াইন, গোয়াইন ও চেঙ্গেরখাল নদীপথ এখন এক আতঙ্কের নাম। যৌথ বাহিনী ও র্যাবের দফায় দফায় অভিযানও যেখানে ব্যর্থ, সেখানে নৌপথে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে কায়েম করা হয়েছে ‘চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্য’। গোয়াইনঘাট সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিক ও তার সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনীর জিম্মি দশায় এখন দিশেহারা বালু-পাথর ব্যবসায়ী, নৌযান মালিক ও সাধারণ শ্রমিকরা। সরকারি কোনো ইজারা ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদের ভুয়া নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সরজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিয়াইন, গোয়াইন ও চেঙ্গেরখাল নদীপথের হাজিপুর, লাঠি, কইনা, জঙ্গল এবং নতুন বাজার পয়েন্টে বালু ও পাথরবোঝাই নৌকা এবং বাল্কহেড আটকে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন বিএনপি নেতা আতিক। গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) কিংবা জেলা পরিষদের কোনো দপ্তর থেকেই সদর ইউনিয়ন পরিষদের নামে এই নদীপথের কোনো বৈধ লিজ বা ইজারা দেওয়া হয়নি। তবুও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে, দলীয় শক্তির দাপট দেখিয়ে নৌকা প্রতি ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করছে আতিকের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নামানো হচ্ছে শারীরিক নির্যাতন ও নৌযান জব্দের মতো নির্মম নিপীড়ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আতিকের এই অপতৎপরতা ও বেপরোয়া ভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার-হাটে খোশগল্পের ছলে আতিক নিজেই দম্ভোক্তি করে বেড়ান “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ওসি নাকি তার বাম পকেটে থাকেন, আর ডান পকেটে থাকেন জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা!” চাঁদার টাকার মোটা অংশ জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের টেবিলে পৌঁছে দেওয়ার দাবি করে পুরো এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন এই বিতর্কিত নেতা। তার সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনীর মহড়ায় সীমান্তবেষ্টিত পুরো এলাকায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শুধু নৌপথে চাঁদাবাজি ও ত্রাস সৃষ্টিই নয়, বিএনপি নেতা আতিকের বিরুদ্ধে মানবপাচারের মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িত থাকার চরম অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। জানা গেছে, আতিকের নেতৃত্বাধীন চক্রটি দীর্ঘ দিন ধরে সীমান্তপথ দিয়ে শত শত নিরীহ মানুষকে ভারতে পাঠানোর নামে এক বিষাক্ত পাচার সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছে। প্রতিবাদী কণ্ঠকে হুমকি-ধমকি, মিথ্যা মামলা ও সংঘাতের ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে আতিকের এই অপরাধ সাম্রাজ্য।
আতিক বাহিনীর লাগামহীন নৌ-সন্ত্রাস ও চরম চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে নৌযান মালিক ও শ্রমিকের দল। এই অত্যাচার অবিলম্বে বন্ধ না হলে সিলেটের গোয়াইনঘাটকে ব্যবসার জন্য সম্পূর্ণ ‘অনিরাপদ এলাকা’ ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। একই সাথে সমস্ত নদীপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখে একযোগে কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), নৌ পুলিশ প্রধান ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আতিকের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যোগাযোগ করা হলে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানান, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত অবগত নই। তবে অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে অবিলম্বে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। কোনো অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অন্যদিকে, পুরো বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর সরকারি মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের তীব্র ক্ষোভ ইউনিয়ন পরিষদের নাম ভাঙিয়ে প্রসাশনের নাকের ডগায় এমন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও লাঠিয়াল বাহিনীর তাণ্ডব চললেও প্রশাসনের নিরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনতিবিলম্বে আতিক বাহিনীর মূলোৎপাটন করে নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
Leave a Reply