সিসিকের টেন্ডার যেনও আকবর, রাখাল ও অরুণ'র পৈতৃক সম্পত্তি! | তদন্ত রিপোর্ট

রবিবার, ২৬ Jul ২০২৬, ০১:৪৪ অপরাহ্ন

সিসিকের টেন্ডার যেনও আকবর, রাখাল ও অরুণ’র পৈতৃক সম্পত্তি!

সিসিকের টেন্ডার যেনও আকবর, রাখাল ও অরুণ’র পৈতৃক সম্পত্তি!

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক: ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলায়; কিন্তু বদলায় না দুর্নীতির চিরচেনা রূপ। সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া যেন গুটিকয়েক রাঘববোয়ালের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি সিসিকের প্রায় ২০০ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের ই-টেন্ডার উন্মুক্ত হওয়ার পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকে দেওয়ার মতো। এই বিপুল অঙ্কের কার্যাদেশের সিংহভাগই অর্থাৎ প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার কাজ এককভাবে লুফে নিয়েছে ‘মেসার্স পুষ্পা কনস্ট্রাকশন’। আর এর মধ্য দিয়ে আবারও উন্মোচিত হলো সিসিকের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা এক অশুভ সিন্ডিকেটের নগ্ন আধিপত্য।

Manual5 Ad Code

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ আজ সিসিকে চরমভাবে বিপর্যস্ত। মেসার্স পুষ্পা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী রাখাল দে এবং তার অন্যতম সহযোগী অরুণ দে এই দুই নাম এখন সিলেটের সাধারণ ঠিকাদারদের কাছে এক মূর্ত আতঙ্কের সমার্থক। একাধিক প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এই চক্রটি সিসিকের শতকোটি টাকার মেগা প্রকল্পগুলো একচেটিয়াভাবে নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে। সরকারের পটপরিবর্তন হলেও এই ‘টেন্ডার নিয়ন্ত্রক’দের টিকিটি ছুঁতে পারেনি কেউ; বরং তাদের আধিপত্যের শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়েছে। গত ২১ জুলাইয়ের টেন্ডারে এককভাবে ১৫৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রাপ্তি সেই অমোঘ সত্যকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Manual1 Ad Code

এই হরিলুটের নেপথ্যের প্রধান কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের দিকে। ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের সুস্পষ্ট অভিযোগ আলী আকবরের প্রত্যক্ষ মদদ ও নির্লজ্জ স্বজনপ্রীতির সুবাদেই মেসার্স পুষ্পা কনস্ট্রাকশন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বারবার কাজ পেয়ে যাচ্ছে। যোগ্য ও অভিজ্ঞ অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা ঠুনকো অজুহাতে অন্যায়ভাবে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে ফেলে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার এই মহোৎসব পুরো দরপত্র মূল্যায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে চরম উপহাসে পরিণত করেছে।

Manual1 Ad Code

সম্প্রতি সিসিকের বিভিন্ন এলাকার ড্রেন, সড়ক ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণসহ মোট ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারি ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ১৪ লাখ থেকে শুরু করে ২৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের এসব প্রকল্পে অংশ নিয়েও সাধারণ ঠিকাদাররা ওই সিন্ডিকেটের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন। দুর্নীতির এই করাল গ্রাস কেবল একটি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়মের আরও পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, ‘চালী কনস্ট্রাকশন’ নামক অপর একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই ৩০ লাখ টাকা কনসালটেন্সি ফি প্রদান করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি না থাকলেও কাগজের পাতায় ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ভুয়া সার্টিফিকেট ইস্যু করা এবং একই প্রতিষ্ঠানকে আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকার অ্যাসফল্ট প্রকল্প অবৈধভাবে পাইয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা সচেতন মহলকে হতবাক করেছে।

Manual3 Ad Code

সিসিকের দুর্নীতির এই বরপুত্র, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি দীর্ঘ। নথিপত্র ও বিভিন্ন মহলের তথ্যমতে, তিনি ইতোমধ্যেই শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। ক্ষমতার লাগামহীন অপব্যবহার, চাঁদাবাজি এবং বিপুল দুর্নীতির অভিযোগে তিনি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রাডারে রয়েছেন। এর আগে সিসিকের একটি নির্মাণাধীন ভবনে অবহেলাজনিত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মামলায়ও তিনি প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন। সাধারণ ঠিকাদারদের ন্যায্য বিল মাসের পর মাস আটকে রেখে মোটা অঙ্কের উৎকোচ বা ঘুষ দাবির বিস্তর ও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতির এই সুবিশাল হিমশৈল নিয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি তা সদম্ভে এড়িয়ে যান।

সিসিকের এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে সুশীল ও সচেতন নাগরিক সমাজ আজ সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। তাদের দ্ব্যর্থহীন দাবি অবিলম্বে এসব অনিয়মের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। সদ্য সমাপ্ত মেগা প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করে এই দুর্নীতির মহোৎসবে জড়িত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, সিসিকের উন্নয়নযাত্রা এই রাঘববোয়ালদের পেটেই চিরতরে হারিয়ে যাবে, আর সাধারণ নাগরিকদের করের টাকা পরিণত হবে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজের পকেট ভরার হাতিয়ারে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code
error: Content is protected !!