নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নে পুলিশি ছত্রছায়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব ও হরিলুট নিয়ে ‘জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে সাহসী ও তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর অবশেষে টনক নড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। সংবাদ প্রকাশের পরপরই গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর, ২০২৬) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খাদিমনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে টানা ৬ ঘণ্টা সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট)।
এই অভিযানে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ ঘনফুট অবৈধ বালু সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি বালু বোঝাই একটি ট্রাক আটক করা হয়েছে। তবে রহস্যজনকভাবে অভিযানের খবর আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ঘটনাস্থল থেকে কোনো বালুখেকো বা সিন্ডিকেট সদস্যকে আটক করতে পারেনি প্রশাসন।
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর, ২০২৬) জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এর অনলাইন সংস্করণে “খাদিমনগরে বালুখেকোদের পাহারায় পুলিশ: ভাগ পাচ্ছে ওসিও!” (ধারাবাহিক পর্ব নং-০২: খাদিমনগরে বালু হরিলুট: বখরায় বালুখেকোদের পাহারাদার এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ!) শিরোনামে মোঃ রায়হান হোসেনের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা হয় কীভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় এবং এয়ারপোর্ট থানা পুলিশের একটি অসাধু অংশের প্রত্যক্ষ মদদে মাসোহারার বিনিময়ে খাদিমনগরের নদী ও সরকারি ছড়া গিলে খাচ্ছে একটি বেপরোয়া সিন্ডিকেট। তোলপাড় সৃষ্টি করা এই সংবাদের পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন এবং বৃহস্পতিবার মাঠে নামে মোবাইল কোর্ট।
সিলেট সদর উপজেলা ভূমি অফিসের প্রেস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, খাদিমনগর ইউনিয়নের ৬, ৭ ও ৮ নং ওয়ার্ডের সরকারি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দিনভর এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। সিলেট সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শিহাব সারার অভী-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এবং ব্যাটালিয়ন আনসারের একটি দল সহযোগিতা করে।
সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে মোট ১৩,৫০০ ঘনফুট বালু ও একটি ট্রাক জব্দ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে, ৫নং ওয়ার্ডের মুড়ারগাঁও এলাকার ইলিয়াছড়া হতে অবৈধভাবে উত্তোলিত সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নিকটবর্তী এলাকা থেকে আনুমানিক ২,০০০ ঘনফুট বালু। ৬নং ওয়ার্ডের বদনাছড়া কালাগুল মাদ্রাসা সংলগ্ন ঘাট হতে প্রায় ৩,০০০ ঘনফুট বালু। ৮নং ওয়ার্ডের এওরারটুক মোটরঘাট হতে অনুমিত ৬,৫০০ ঘনফুট বালু এবং একই মোটরঘাটের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ এলাকা হতে আরও প্রায় ২,০০০ ঘনফুট বালু। ৭ নং ওয়ার্ডের সাহেবের বাজার সংলগ্ন এলাকা হতে ১টি বালু বোঝাই ট্রাক আটক করা হয়।
এছাড়াও, পৃথক আরেকটি অভিযোগের ভিত্তিতে ছালিয়া মৌজার কাকুয়ারপার এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে টিলা কাটার প্রাথমিক প্রমাণ পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট বরাবর প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে।
সিন্ডিকেট ধরাছোঁয়ার বাইরে, জনমনে প্রশ্ন? বিপুল পরিমাণ অবৈধ বালু, ট্রাক এবং টিলা কাটার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিললেও দিনভর পরিচালিত এই অভিযানে বালু উত্তোলন বা টিলা কাটার সাথে জড়িত কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি বলে প্রেস রিলিজে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকায় যাদের বিরুদ্ধে বালুখেকোদের পাহারা দেওয়া ও বখরা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সেই সোর্সদের মাধ্যমেই কি অভিযানের খবর আগেভাগে বালুখেকোদের কাছে পৌঁছে গেছে? তা না হলে হাজার হাজার ঘনফুট বালু ও ট্রাক রেখে সিন্ডিকেটের সদস্যরা কীভাবে নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেল?
সচেতন মহলের দাবি, কেবল পরিত্যক্ত অবস্থায় বালু বাজেয়াপ্ত করলেই এই মহোৎসব থামবে না বরং পরিবেশ ধ্বংসকারী এই মূল হোতাদের এবং তাদের নেপথ্যে থাকা অসাধু প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।